আগস্টে নির্বাচনের তফসিল, ইউপি দিয়ে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন
আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবর প্রথমার্ধ থেকে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
মঙ্গলবার ইসি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য একটি সমন্বিত রোডম্যাপ বা পথরেখা তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন। এর আওতায় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য আলাদা আলাদা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ এই রোডম্যাপ চূড়ান্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হতে পারে।
উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, অক্টোবরের প্রথম দিকেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া নির্বাচন শুরুর পরবর্তী ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যেই স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকা সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
ইসি সচিবালয় জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে। কমিশনের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি পৌরসভা নির্বাচনও আয়োজন করা হতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শেষ করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।
রহমানেল মাছউদ বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরের নির্বাচন বাকি রয়েছে। সংবিধান ও আইনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এসব নির্বাচন পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করতে হবে। কমিশন ইতোমধ্যে অক্টোবরকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে।
অতীতে ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের সময়েও অনেক প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে আমরা দলকে, দলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে কাজ করেছি। ভূমিকা রেখেছি। আমাদের ও নেতাকর্মীদের এই ত্যাগের বিনিময়ে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আমাদের দল বিএনপি দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন।—বেনজির আহমেদ টিটো, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি
তিনি বলেন, কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে, সে বিষয়ে কমিশনের আনুষ্ঠানিক কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বাস্তবতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় প্রথমে ইউপি এবং পৌরসভা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। উপজেলা পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের গুরুত্ব রয়েছে। তাই এ দুটি নির্বাচন আগে সম্পন্ন করে পরবর্তী সময়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান।
নির্বাচন কমিশনার মাছউদ বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে পাবলিক পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান, বর্ষা মৌসুম এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক ও যোগাযোগ পরিস্থিতি। এসব বিষয় পর্যালোচনা করেই কমিশন চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা করবে।
সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনও এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি এবং সরকারের পক্ষ থেকেও কমিশনের কাছে কোনো চিঠিও আসেনি। তবে কমিশন নিজস্ব উদ্যোগে সব ধরনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি সংসদে বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে বলেও তিনি জানান।
দেশে বর্তমানে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং প্রায় চার হাজার ৫৭০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদে প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দলীয়ভাবে পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। যদিও এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় কোনো প্রতীক থাকছে না। এজন্য দলীয় মনোনয়নেরও কোনো বিষয় নেই। সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার পরও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দলের সমর্থিত প্রার্থী বাছাই করছে এবং ঘোষণা করছে। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও উপজেলায় তাদের সমর্থিত মেয়র ও চেয়ারম্যান প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। জামায়াতে ইসলামী আসন্ন স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য ১২টি সিটিতে তাদের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে। তরুণ নেতৃত্বকে প্রাধান্য দিয়ে দল এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার এই প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের দলীয় প্রস্তুতি চলছে। এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় একই স্থানে দল সমর্থিত একাধিক প্রার্থী হওয়ায় আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করতে বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলার নির্দেশনা দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে আমরা আশা করছি, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে সফলতা তা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও বিএনপি ধরে রাখতে পারব।— ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম
১২ সিটি করপোরেশনে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী দলের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্র থেকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীর নাম প্রকাশ্যে এসেছে। তার মধ্যে রয়েছে, ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, ঢাকা উত্তরে সেলিম উদ্দিন (মহানগর উত্তরের আমির), চট্টগ্রাম সিটির শামসুজ্জামান হেলালী (মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক), গাজীপুর সিটির হাফিজুর রহমান (তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক), নারায়ণগঞ্জ সিটির আবদুল জব্বার (মহানগর শাখার আমির), রংপুর সিটির এ টি এম আজম খান (মহানগর আমির)। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর মহিলা কর্মীরা সারা দেশে নানাভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।
জাতীয় সংসদ ও নির্বাচনে জামায়াতের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচন তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন তারা এককভাবে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ দলটিও তাদের সমর্থিত ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রার্থী দলের মুখপাত্র অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিবের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এর বাইরে দলটি সারাদেশে তাদের সমর্থিত আরও শতাধিক মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।
তবে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণ ও চূড়ান্তকরণে সরকারি দল বিএনপি এখনও নীরবতা পালন করছে। দলীয়ভাবে তাদের সমর্থিত কোনো প্রার্থীর নাম এখনো তারা ঘোষণা করা হয়নি। তবে বর্তমানে সরকারের নিয়োগ দেয়া যে দুজন দলীয় নেতা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন তারা মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এছাড়া সারা দেশের সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদেও দলের অনুমোদন ছাড়াই নিজ নিজ উদ্যোগে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে একাধিক নেতা পোস্টার ব্যানার, বিলবোর্ড লাগিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় নির্বাচনে দলের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের কথা বলে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের সঙ্গে।
তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের দলীয় ফোরামের কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আমাদের ‘সেইভাবে’ কোনো আলাদা প্রস্তুতিও নেই। নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিজেদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে স্থানীয় নেতারা নির্বাচনে অংশ নেবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী আহমেদ ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ইসি স্থানীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলে আমরা সেই সিদ্ধান্ত দলীয়ভাবে বাস্তবায়ন করব। এখন আলাদা কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
এদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। এই নির্বাচনে সরকারি দল হিসেবে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ তেমনি চ্যালেঞ্জের। জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখাই হবে ক্ষমতাসীনদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও তাদের অন্যান্য সমমনা দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জোরালো প্রস্তুতি শুরু করেছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য এখনও প্রস্তুতি শুরু করেনি ক্ষমতাসীন দল।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গোছানোর মতো সময় দিতে পারছে না। বলা যায় বিএনপি এ বিষয়ে অনেকটা পিছিয়ে ও উদাসিন রয়েছে। জামায়াত ও এনসিপি এবং অন্যান্য দল তাদের সমর্থিত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ে একেক স্থানে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় দলীয় কোন্দল মেটানো এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা দলটির জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
সূত্র মতে, স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি কেমন ফলাফল করে, তা তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে এই নির্বাচনগুলো মূলত বিএনপির তৃণমূলের নেতৃত্ব কতটা শক্তিশালী এবং তারা জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে কি না, তা স্পষ্ট করবে।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির দলীয় কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। দলের অনেক নেতা এখন সরকারে দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রিসভার বৈঠক, সংসদীয় দায়িত্ব, বৈশ্বিক পরিস্থিতি সামাল দেয়া এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নেই তাদের সব ব্যস্ততা। দলের স্বাভাবিক কোনো কর্মসূচি নেই। তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব অনেক। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দূর করে প্রতিটি পদে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা বিএনপির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের দলীয় ফোরামের কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আমাদের ‘সেইভাবে’ কোনো আলাদা প্রস্তুতিও নেই। নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিজেদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে স্থানীয় নেতারা নির্বাচনে অংশ নেবেন।— রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি
তবে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বাইরে অন্য নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গোছানো এবং যোগ্য ও জনপ্রিয় একক প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ বিএনপি শুরু করেছে। তাদের মতে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় স্বতন্ত্রভাবে ক্লিন ইমেজের প্রার্থীদের নির্বাচনে নামানোর কৌশল নিয়ে দলটি এগিয়ে যাচ্ছে। দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দূর করে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতেও সাংগঠনিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক ও সমঝোতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক শুন্যতা পূরণের বিষয় নয়, এটি দলকে আবার মাঠে সক্রিয় করারও সুযোগ। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা, বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো এবং নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এই তিন চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে দলটিকে। এর বাইরে বাড়তি হিসেবে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধীদল জামায়াত-এনসিপির শক্তিশালী একক প্রার্থীর মোকাবেলার বিষয়টিও তাদের সামলাতে হবে। যা খুব সহজ হবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলীয় কোনো নির্দেশনা বা দায়িত্ব এখনও পাননি বলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজির আহমেদ টিটো। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দলীয়ভাবে আমি বা আমরা কোনো নির্দেশনা বা দায়িত্ব পাইনি।
টিটো বলেন, অতীতে ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের সময়েও অনেক প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে আমরা দলকে, দলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে কাজ করেছি। ভূমিকা রেখেছি। আমাদের ও নেতাকর্মীদের এই ত্যাগের বিনিময়ে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আমাদের দল বিএনপি দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন।
বেনজির টিটো বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বৈরশাসনেও আমরা দলকে সুসংগঠিত করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে আমাদের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা ও দায়িত্ব দিলে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে আবারও সফলতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারব বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
এছাড়া, এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় একই পদে একাধিক প্রার্থী দাঁড়ানোর ঝুঁকি আরো বেড়েছে। দলীয় সমর্থন না পাওয়া প্রার্থীরাও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারেন এমন আশঙ্কা রয়েছে বিএনপির।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের দলীয় প্রস্তুতি চলছে। এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় একই স্থানে দল সমর্থিত একাধিক প্রার্থী হওয়ায় আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করতে বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলার নির্দেশনা দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে আমরা আশা করছি, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে সফলতা তা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও বিএনপি ধরে রাখতে পারব।