ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও সনদধারী চাকরিরতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা— প্রশ্ন আখতারের, উত্তর দিলেন মন্ত্রী
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে সিভিল, মিলিটারি এবং জুডিশিয়ারিতে চাকরিরতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তা জানতে চেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। একই সঙ্গে ৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তাও জানতে চেয়েছেন তিনি। আজ বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশে তিনি এসব প্রশ্ন করেন।
আখতার হোসেন তার নোটিশে বলেন, বিগত দেড় দশকে প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর দপ্তরগুলোতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পেয়ে ঘাপটি মেরে থাকা বিশাল সংখ্যক সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমানে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আখতার বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৯০ হাজার ৫২৭ জনের সনদ যাচাই-বাছাইকালে ইতিমধ্যে অন্তত ৮ হাজার জনের সনদে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে এবং প্রতি ১০০ জনের মধ্যে সাত-আট জনের তথ্যে গুরুতর গলদ পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৪ সালে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ সচিবের ভুয়া সনদের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়া থেকে এটি স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই জালিয়াতি কতটা সুপরিকল্পিতভাবে প্রথিত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এই বিশাল সংখ্যক ভুয়া সনদধারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখলেও অভিযোগ রয়েছে যে, অভিযুক্তরা নানাভাবে তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিগত স্বৈরাচারী আমলে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এই চক্রকে অবিলম্বে চাকরিচ্যুতি করে আইনের আওতায় আনা না হলে, এরা রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য পাচার করে কিংবা সিভিল, মিলিটারি বা জুডিশিয়ারি ক্যু’র উস্কানি দিয়ে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে বড় ধরনের জাতীয় সংকট তৈরি করতে পারে।
আখতার হোসেন আরও বলেন, এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, প্রশাসনে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসনের সকল ষড়যন্ত্র সামগ্রিকভাবে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে তদন্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত রেখে ভুয়া সনদধারী সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দ্রুততম সময়ে চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে সরকার কি ধরনের কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা এই মহান সংসদে জানানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এর জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান বলেন, বর্তমান সরকার যে সকল অমুক্তিযোদ্ধা ও তাদের ওয়ারিশরা জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু করেছে। শুধু কোটার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তরাই নয়, যে সকল অমুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্রের অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করেছে, তাদের বিষয়েও সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
এ সময় সম্পূরক প্রশ্নে আখতার হোসেন বলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, মহান মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের দেশে কিছু অসাধু লোক একটা ব্যবসায় পরিণত করেছিল। এটা এমন একটা ব্যবসা ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধের যদি একটা ভুয়া ডিগ্রি তারা নিতে পারত, তবে সেক্ষেত্রে তাদের চাকরি হয়ে যেত, নানা রাজনৈতিক দলে তারা পদ-পদবি পেত এবং নানাভাবে তারা ভাতা ও সুবিধা ভোগ করতে পারত। এইসব ব্যক্তিবর্গ একই সাথে আমাদের যারা মেধাবী আছে তাদেরকে নানাভাবে কোণঠাসা করেছে এবং একইভাবে তারা নানা ধরনের অন্যায়ের সাথে নিজেদেরকে লিপ্ত করেছে।
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি যে, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার অর্ধশত বছর চলে যাওয়ার পরেও এখনো পর্যন্ত আসলে কতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেটার সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা নাই। কেন নাই? কারণ, যে তালিকাটা দেওয়া হয়, সে তালিকার বিপরীতে এখন প্রায় ৭৯ হাজার ব্যক্তির ব্যাপারে এই অভিযোগ আছে যে, তারা আসলে মুক্তিযোদ্ধাই না। এই সংখ্যাটা কিন্তু কম না— ৭৯ হাজার! যাদের ব্যাপারে অভিযোগ আছে যে তারা মুক্তিযোদ্ধাই না, অথচ তারা কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় ভাতা গ্রহণ করছে। এটা অত্যন্ত বড় একটা সংকটের জায়গা তৈরি করছে।
এনসিপির সদস্যসচিব আরও বলেন, এই সংকটটা কতটা গভীরে প্রথিত হয়েছিল যে, বাংলাদেশে একটি দল— আওয়ামী লীগ, তারা তাদের দুঃশাসন, ফ্যাসিবাদ, জুলুম ও নিপীড়নের বিপরীতে ঢাল হিসেবে এই মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করত। কিছু লোক ব্যক্তিগত পর্যায়ে এটা ব্যবহার করেছে, আর আওয়ামী লীগ এটা দলগতভাবে ব্যবহার করেছে। এই কারণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন থাকবে— এই যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল, আমরা কি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক পরিসংখ্যান ও সঠিক সংজ্ঞায়ন পাব? এবং যারা আসলে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বা অমুক্তিযোদ্ধা, তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কিনা, সে ব্যাপারে মন্ত্রীর কাছে আমি জানতে চাই।
এই প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, এই যে একটি পত্রিকায় এসেছে যে ৭৯ হাজার অমুক্তিযোদ্ধা, এটাও আসলে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে না। এই সংখ্যাটা আরো বাড়তে পারে। এই যে শহীদের সংখ্যা বা মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে একটা বিতর্ক, এই বিতর্কের জের ধরেই আমাদের বাংলাদেশের মহান অভিভাবক, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আজন্ম যোদ্ধা, আমাদের প্রিয় দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও ওই ফ্যাসিবাদী সরকার মামলা করেছিল। কাজেই এই বিষয়ে সরকার— যেহেতু এটি মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের সরকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালিত সরকার— আমরা এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেব না। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা গুরুত্বের সাথে কাজ করছি। আশা করি মাননীয় সংসদ সদস্য অচিরেই তা দেখতে পাবেন।