কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে কী হচ্ছে এনসিপিতে
চট্টগ্রামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন ও মহানগর নেত্রী সাদিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে দলীয় পদ ও চাকরির আশ্বাসে মদের বারে ডেকে যৌন হযরানির অভিযোগ তুলেছেন এক নারী কর্মী। এঘটনায় দলটির কেন্দ্র থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্তদের পক্ষাবলম্বন করে বিবৃতি দিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপি। এঘটনায় মহানগরের দুই নেতাকে শোকজ করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার (১৯ জুন) চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ির একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির ওই নারী কর্মী অভিযোগ করেন, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম মহানগর নেত্রী সাদিয়া আফরিন তার সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করেছেন।
তার দাবি, গত ১৪ জুন নারীশক্তির কমিটি নিয়ে সাংগঠনিক আলোচনার কথা বলে সাদিয়া আফরিন তাকে নগরীর একটি হোটেলে নিয়ে যান। সেখানে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিনসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। ওই পরিবেশে তাকে ধূমপান ও পানীয় গ্রহণে উৎসাহিত করা হয় এবং পরে তিনি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সাদিয়া আফরিন স্থান ত্যাগ করলে সুজা উদ্দিন তার প্রতি আপত্তিকর আচরণ ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। এছাড়া রাজনৈতিক পদ-পদবি ও বিভিন্ন সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় এবং প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়
ওই নারী কর্মী নিজেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, এনসিপির কর্মী এবং চট্টগ্রাম মহানগর নারীশক্তির পদপ্রত্যাশী হিসেবে পরিচয় দেন।
এ ঘটনায় ১৭ জুন চট্টগ্রামের চকবাজার থানায় সুজা উদ্দিন ও সাদিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনের পর এনসিপির কেন্দ্র থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত ও শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও মানহানিকর’ বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযোগগুলো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর পেছনে একটি ষড়যন্ত্র কাজ করছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অনুমাননির্ভর মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
তবে তদন্তাধীন বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থি হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা কমিটি। এ কারণে চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব ও সদস্য সচিব আরিফ মুঈনুদ্দিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে বলা হয়, অভিযোগটি এখনও তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় মহানগর কমিটির প্যাডে প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি সরাসরি পক্ষাবলম্বন করেছেন, যা দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থি। নোটিশে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা কমিটির প্রধানের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মুঈনুদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি চট্টগ্রাম মহানগর কমিটিকে আগে জানানো হয়নি। অভিযোগটি তাদের কাছে ভিত্তিহীন মনে হওয়ায় তারা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ আমরা দেখেছি, অভিযোগকারী তরুণীর সঙ্গেও কথা বলেছি। ফুটেজে কোনো ধরনের আপত্তিকর কিছু দেখা যায়নি। ১০-১২ মিনিট সবাই বসে কথা বলেছে, পরে চলে গেছে। মেয়েটিও স্বাভাবিকভাবেই বিদায় নিয়েছে। যাওয়ার সময় ‘হাই’ দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগকারীকে দলের পরিচিত কর্মী নন, মেয়েটি মাত্র কয়েকদিন আগে একটি অনলাইন ফরম পূরণ করে দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর আগে তাকে সংগঠনের কার্যক্রমে দেখা যায়নি।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম অঞ্চল তত্ত্বাবধায়ক মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অভিযোগটি বর্তমানে দলের পক্ষ থেকে তদন্তাধীন রয়েছে। আগামীকাল বা পরশুর মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এবং সাংগঠনিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হলে, দল আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
তিনি আরও বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। দলের সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জিডির প্রেক্ষিতে তদন্তের জন্য আদালতের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।