এখন আর কেউ বলে না ‘খেলা হবে’: জামায়াত আমীর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান নারায়ণগঞ্জে এক সম্মেলনে বলেছেন, আপনারা ত্বকী হত্যার বিচার পেয়েছেন? শুধু রক্ত আর কাড়ি কাড়ি লাশ এখানে উপহার দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলতেন, ‘খেলা হবে’। এখন আর কেউ বলে না ‘খেলা হবে’। এখন এখানে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তাড়া করছে। চাঁদাবাজরা ব্যবসায়ীদের ভালো থাকতে দিচ্ছে না। বিএনপির নেতারা বলেন দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবেন, আর ঘরে ঘরে চাঁদাবাজ লেলিয়ে রেখেছেন। কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই। মদের বিপণন ও উৎপাদনকারীর কেবল হাতবদল হয়েছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) নারায়ণগঞ্জ জেলা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখা জামায়াত কর্তৃক আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমীর। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা মো. আবদুল জব্বার। সঞ্চালনা করেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসাইন।
সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত সময়ে সংসদে বিরোধী দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলত আওয়ামী লীগ। তারা সবচেয়ে বেশি বলত বিএনপিকে, তারপর জামায়াতে ইসলামীকে। বর্তমান সরকারও বিরোধী দলকে বিভিন্ন ধরনের ট্যাগ দিয়ে কথা বলে। কিন্তু দেশের জনগণ এগুলো খায় না। সরকারকে উদ্দেশ করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আপনারা তরুণ সমাজের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। আওয়ামী লীগের পথে হাঁটবেন না। যারা আজ শহিদ পরিবার ও পঙ্গু ভাইবোনদের প্রতি অবজ্ঞা ও উপহাস করে কথা বলেন, তারা নিজেদের সঙ্গেই প্রতারণা করছেন।
তিনি আরও বলেন, কালো টাকা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ইঞ্জিনিয়ারিং সবকিছুকে উপেক্ষা করে আপনারা নারায়ণগঞ্জে ১১-দলীয় জোটকে একটি আসনে জয়ী করেছেন। ভোট গ্রহণ যেভাবে সুষ্ঠু হয়েছে, ভোট গণনা এবং ফলাফলও যদি সুষ্ঠু হতো, তাহলে বাকি আসনগুলোতেও জোটের বিজয় হতো। কারণ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়েছে। নির্বাচনের আগে বাসে, গাড়িতে, লঞ্চে, রাস্তাঘাটে— সব জায়গায় একই আওয়াজ উঠেছিল, ‘দাঁড়িপাল্লা, দাঁড়িপাল্লা’।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর উল্লেখ করেন, একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে। এর মধ্যে গণভোটের পক্ষে প্রথমে বিএনপি ছিল না। পরে বাধ্য হয়ে শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিল, ‘আপনারা গণভোটে হ্যাঁ-তে ভোট দেবেন।’ একবারই তিনি প্রথম এবং শেষবারের মতো একথা বলেছেন। এরপর জনগণ ৬৭ শতাংশের বেশি ভোট দিল। তিনি প্রশ্ন রাখেন, সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি এর কী মূল্য দিলেন? তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনটা যাতে হয়ে যায়, সেজন্য একথা বলেছি।’ এটা লজ্জার। একটি সংগঠনের শীর্ষস্থান থেকে যদি জনগণকে ধোঁকা দেওয়া হয়, তাহলে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে থাকবে? মানুষ কেন রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করবে? আমরা সেই রাজনীতি করিনি, করবও না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকার ইতোমধ্যে অনেক অঘটন ঘটিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে দলীয় লোক বসিয়ে একদলীয় শাসন কায়েম করতে চাইছে। জনগণ তা মেনে নেবে না। তরুণদের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে দেশ শাসন করলে জনগণ আপনাদের বিরুদ্ধে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে যাবে। শেখ মুজিবুর রহমানও একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন। অর্ধেক বছরও ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। দুর্নীতি আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। যদি এই অবস্থা জারি থাকে, তাহলে একটি গোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, জনগণের নয়।
নারায়ণগঞ্জের ব্যাপারে জামায়াত আমীর বলেন, এক সময় এই জেলাকে প্রাচ্যের ডান্ডি বলা হতো। এটি ছিল বাণিজ্যিক রাজধানী আর ঢাকা ছিল প্রশাসনিক রাজধানী। নারায়ণগঞ্জ তার গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। মাঝখানে সন্ত্রাসের রাজধানী হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাইফুল আলম খান মিলন এমপি বলেন, আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই। সবাই যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। আমরা হাল ছাড়িনি। ভয় দেখিয়ে আমাদের পথ থেকে বিরত রাখা যাবে না। আমরা নতুন বাংলাদেশ চাই। ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ চাই। যে জন্য জীবন দিয়েছিল আবু সাঈদ, সেই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সৎ ও যোগ্য নাগরিক তৈরির মাধ্যমে মানবিক, দেশপ্রেমিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে অবদান রেখেছে। এজন্য নেতৃবৃন্দকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। গত নির্বাচনে দেশের জনগণ ভোট দিলেও ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি আমাদের। সংসদে কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ভয় পায় না। নতুন করে ফ্যাসিবাদী আচরণ করলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রুখে দেওয়া হবে। তিনি নারায়ণগঞ্জে সংগঠনকে আরও মজবুত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইসলামী আন্দোলনকে আল্লাহ সহজ করেননি। আন্দোলন যত বড় হয়, ষড়যন্ত্রও তত বাড়ে। সবাই একসঙ্গে হয়ে ষড়যন্ত্র করবে। জামায়াতে ইসলামীর কাজ হচ্ছে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, অবহেলার কারণে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন হচ্ছে না। আমরা সমস্ত শক্তি দিয়ে এ জেলার জনগণের অধিকার আদায় করে ছাড়ব। নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রয়োজন উল্লেখ করে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানান।