১৬ জুন ২০২৬, ১৭:০৬

অভিযোগ ইউএনও’র বিরুদ্ধে, ইউএনও দুষলেন কৃষি অফিসারকে

মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ পারভেজ ,রংপুর ৫ আসনের সংসদ সদস্য জনাব গোলাম রব্বানী  © সংগৃহীত

সরকারি কর্মসূচিতে ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুসরণ না করে জাতীয় সংসদ সদস্যকে অবহেলা ও অবজ্ঞার অভিযোগ উঠেছে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ পারভেজ এর বিরুদ্ধে। এঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা।

গতকাল সোমবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে মিঠাপুকুর  উপজেলার পদাগঞ্জে বাগান থেকে ঐতিহ্যবাহী জিআই পণ্য হাঁড়িভাঙ্গা আম ছিড়ে বাজারজাত কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রংপুর -৫ আসনের এমপি গোলাম রব্বানীকে নিমন্ত্রণ না দেওয়ার অভিযোগকে ঘিরে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এঘটনার জন্য ইউএনও ও ডিসি উপজেলা কৃষি অফিসারকে দায়ী করেছেন। অপরদিকে  উপজেলা কৃষি অফিসার ডিসিকে দায়ী করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি প্রটোকল বা কার্যবিধি (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) অনুযায়ী, এমপি হলেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রধান জনপ্রতিনিধি ও আইনপ্রণেতা। তাই উপজেলার যেকোনো সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি বা সম্মানিত অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হওয়ার অধিকার রাখেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের যেকোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ও সরকারি অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানাতে হবে এবং তার সময় ও সুবিধা বিবেচনা করে অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করতে হবে। 

এদিকে এ প্রটোকল জানা সত্বেও মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ পারভেজ রংপুর -৫ আসনের এমপি গোলাম রব্বানীকে না জানিয়েই উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ লোকমান হেকিমের  যোগসাজশে ১৫ জানুয়ারি হাড়িভাঙ্গা আমের বাজারজাতকরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ২ দিন আগে উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ লোকমান হেকিম ও একদিন আগে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ পারভেজ মুঠোফোনে মৌখিকভাবে এমপি গোলাম রব্বানীকে জানায়। অনুষ্ঠান আয়োজনের পর সরকারি প্রটোকল ভেঙ্গে অনুষ্ঠানের আগের দিন দাওয়াত দেয়ায় সংসদ অধিবেশন থাকার কারণে হাড়িভাঙ্গা আমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেনি স্থানীয় এমপি গোলাম রব্বানী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও কৃষি অফিসারের কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রথা অনুযায়ী উপজেলা প্রশাসনের আয়োজিত সরকারি কর্মসূচিগুলো সংশ্লিষ্ট আসনের এমপিকে জানিয়েই তারিখ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে ও প্রধান অতিথি করা হয়ে থাকে। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। সরকারি প্রটোকল ভেঙ্গে হাড়িভাঙ্গা আমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউএনও পারভেজ স্বেচ্ছাচারী আচরণ করে এমপিকে নিমন্ত্রণপত্র দেয়নি এমন অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মহল। তারা এটিকে একজন জনপ্রতিনিধির মর্যাদাহানির ঘটনা হিসেবে দেখছেন।

এবিষয়ে রংপুর- ৫ আসনের সংসদ সদস্য জনাব গোলাম রব্বানী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান,ওরা আমাকে আগে জানায়নি। ওরা ডিসির কাছে গিয়ে ডেট নিয়েছে। জনগণে ডেট নিয়েছে না কৃষি অফিসার ডেট নিয়েছে। সেটা ওরা ভালো জানে। কৃষি অফিসার গত পরশুদিন আমাকে মুঠোফোনে জানিয়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কথা। আমি বললাম এটাতো নরমালি ২০ তারিখের দিকে হয়। আমি অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মহোদয়কে রাখতে চাইছিলাম। আপনারাতো একা একা ডেট নিলেন। তখন আমাক বললো কৃষকরা ডিসির কাছে গিয়ে ডেট নিয়েছে। গতকাল ইউএনও আমাকে মুঠোফোনে জানায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কথা,যে আমি যাবো কিনা। তখন বললাম আমার কাছেতো ডেট নেয়নি,জানায়নি। আমি যাবো কোথা থেকে। আমিতো ঢাকা চলে যাচ্ছি। পার্লামেন্ট চলতেছে। আমি তখন বাধ্য হয়ে বললাম আপনার ডিসি আসতেছে, আপনি যান।

এবিষয়ে অভিযুক্ত মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ লোকমান হেকিম জানান, গত শনিবার এমপি স্যারকে প্রাগ্রামের কথা জানাই। তখন ওনি বললো, এখনতো অধিবেশন চলতেছে। আমি কিভাবে থাকবো। বন্ধের দিন নিলেইতো হতো। তখন আমি বললাম স্যার এটাতো জেলা প্রশাসক স্যার তারিখ ঠিক করছে। আমি দাওয়াত দেওয়ার বাহক মাত্র। ২০ তারিখ উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিলো। কৃষকরা ডিসি স্যারের কাছে আপত্তি জানায় ওনি ১৫ তারিখ করেছে। 

লোকমান হেকিম আরো জানান, হাড়ি ভাঙ্গা আমের উদ্বোধনী তারিখের বিষয়টা পুরোটাই ডিসি স্যার করেছে। তারপরে ওনি ইউএনও স্যারকে জানিয়েছে। তারপরে আমরা জেনেছি।

এবিষয়ে অভিযুক্ত মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ পারভেজ জানান, যারা অভিযোগ করতেছে তাদের বুঝতে হবে এই প্রোগ্রামটা আমার না। এটি কৃষি অফিসের প্রোগ্রাম। এটা সময় নির্ধারিত ছিলো ১৫ তারিখ। কৃষি অফিস আমাকে বলছে এমপি স্যারের অধিবেশন চলছে। ওনি থাকতে পারবেন না।

রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান,এটা মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি অফিস তারিখ নির্ধারণ করেছে। এটা আমার প্রোগ্রাম না,এটা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম। এবিষয়ে ওরাই ভালো বলতে পারবে। আমি জাস্ট গেস্ট হিসেবে ওখানে গিয়েছিলাম। ওখানে তো জেলা জামাতের সেক্রেটারি ছিলেন, বিএনপির উপজেলা সভাপতি ছিলেন। এমপি মহোদয়কে কেনো জানানো হয়নি। এটা আমি জানি না। আমাকে বলাও হয়নি যে এমপি মহোদয় প্রোগ্রামে যেতে চান বা ওনাকে আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে বা হয়নি। 

উপজেলা কৃষি অফিসার লোকমান হেকিম জানিয়েছে প্রোগ্রামের তারিখ ডিসি স্যার নির্ধারণ করেছে প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে ডিসি বলেন, এটা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং মন্ত্রালয় থেকে তারিখ ফিক্সড করা। যে ১৫ তারিখে হাড়িভাঙ্গা আম হারভেস্টিং করা হবে। ১৫ তারিখের আগে কেউ হাড়িভাঙ্গা আম বাজারজাতকরন করতে পারবে নাহ। এটা এরকম করে নির্ধারণ করা। আমি তারিখ নির্ধারণ করিনি।

প্রসঙ্গত সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জে প্রধান অতিথি হিসেবে বাগান থেকে হাঁড়িভাঙ্গা আম ছিড়ে বাজারজাত কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ রুহুল আমিন। এ সময় তার সাথে ছিলেন কৃষিসম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম, ইউএনও মোঃ পারভেজ, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এনামুল হক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম, কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম রাকিবুল হাসান ফেরদৌসসহ স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতৃবৃন্দ, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।