১২ জুন ২০২৬, ০১:২২

প্রস্তাবিত বাজেট উৎপাদন-বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব: মির্জা ফখরুল

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর  © সংগৃহীত

২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব সৃজনশীল বাজেট হিসেবে অভিহিত করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে সংসদ ভবনে নিজের চেম্বারে বাজেটের ওপর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, সব শ্রেণির মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি একটি ক্রিয়েটিভ বাজেট। এই বাজেট মূলত উৎপাদন-বান্ধব, বিনিয়োগ-বান্ধব এবং ব্যবসা-বান্ধব। এটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় মনে হয়েছে। এই ধরনের বাজেট আমরা আগে কখনো দেখিনি। যে ছাড়গুলো দেওয়া হয়েছে, যে রেয়াত দেওয়া হয়েছে, তা আগে কখনো এতটা ছিল না, যেটা এবার আমরা দেখতে পাচ্ছি।

শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের দিক তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এর ফলে অর্থনীতি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সচল হবে এবং আমরা আশা করি খুব দ্রুত বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আমাদের নেতা তারেক রহমানের নির্দেশে তার চিন্তাভাবনা বিবেচনায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সবার সহযোগিতায় এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন বিকেল তিনটায় বসে। অর্থমন্ত্রী এই অধিবেশনে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। দুই দফা নামাজের বিরতি দিয়ে রাত ৮টা ৮ মিনিটে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপন শেষ করেন। এরপর তিনি বাজেট বিল সংসদে উপস্থাপন করেন।

রাত ৮টা ১০ মিনিটে স্পিকার রোববার বিকেল তিনটা পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন মূলতবি ঘোষণা করেন।

প্রস্তাবিত বাজেটের সৃজনশীল দিকটি তুলে ধরে সংসদে অর্থমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপনের আগে মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন হয়।

সৃজনশীল বাজেট কেন

দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের পর দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থার কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ভঙ্গুর অর্থনীতি, অগোছালো প্রশাসন এবং অর্থনীতির চরম দুরবস্থার মধ্যে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে সরকারের অর্থনীতি পুনর্বাসন ও গতি ফিরিয়ে আনার আন্তরিকতা। এটি একটি সৃজনশীল বাজেট। এর মধ্যে এমন অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা আগে কল্পনাও করা যায়নি।

তিনি বলেন, যেমন ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে। এটি একটি বড় উদ্যোগ। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের প্রধান নারী সদস্যদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে। এ খাতে ১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরে এই বরাদ্দ বাড়বে।

একইভাবে কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে। প্রতি কৃষক আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। মসজিদসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে মাসিক সম্মানী প্রদান করা হবে। খাল খননের মাধ্যমে কৃষিতে সেচ ও পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। মৎস্য চাষসহ বিভিন্ন উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, দেশীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে যারা বিনিয়োগ করবেন তাদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। কর রেয়াতসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

কৃষির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি নতুন ধরনের চিন্তাভাবনা। স্পোর্টস ইকোনমির অংশ হিসেবে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মাসিক সম্মানী প্রদান, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস আয়োজন এবং ইন্টার স্কুল খেলা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং ৬৪ জেলায় ভিলেজ অব ক্রিয়েটিভ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংস্কৃতিকে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। একটি গ্রাম একটি পণ্য উদ্যোগের আওতায় মৃৎশিল্প, বুনন শিল্প, শীতল পাটি, সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ পণ্যকে চিহ্নিত করে বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা হবে। লোকসংস্কৃতি ও হস্তশিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে ১৬০ একর জমির ওপর বিশ্বমানের ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

এসএমই খাতের বিকাশে শর্তসাপেক্ষ ঋণ বিতরণ, প্রবাসী কার্ড প্রদান, হাইটেক পার্কসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ এবং গ্রামীণ সড়ক সংরক্ষণে নারীদের কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিই প্রধান লক্ষ্য। বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আইনি সংস্কার ও সহজীকরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন। শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য খাতে ১ দশমিক ০১ শতাংশে উন্নীত করার ফলে এই দুই খাতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন।

রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে কর প্রদানে হয়রানি রোধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারতেন না। এখন তারা সহজে কর দিতে পারবেন, রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।

করনীতি ও কর ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করা হয়েছে। করদাতার পরিধি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কাস্টমসের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থায় উৎস কর যাচাইয়ের সময় কমানো, জনবান্ধব কর প্রশাসন গঠন এবং রপ্তানিমুখী খাতের কাঁচামাল শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ এই বাজেটের মূল বিষয়। এই বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে তিনি মনে করেন।

মূল্যস্ফীতি রোধ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, উৎপাদন বাড়লে মূল্যস্ফীতি এমনিতেই কমে আসবে।