স্থানীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনেরও প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন বা ইসি। এই নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচনী বিধিমালায়ও কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বুধবার সেই বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে ইসি। দলীয় প্রতীক ছাড়া এই নির্বাচন আয়োজনে ইসির পক্ষ থেকে যে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে, সেখানে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হলে যে কেউ অংশ নিতে পারবে এই নির্বাচনে। এই বিধিমালা পাশ হলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ যে কোন দলের কর্মী সমর্থকরা অংশ নিতে পারবে নির্বাচনে।
এই বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, কোনো দল বাদ দেওয়ার মতো কোনো বিধান আচরণবিধিতে রাখা হয়নি। প্রার্থী হওয়ার যোগ্য যে কেউ অংশ নিতে পারবেন নির্বাচনে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে সংসদে আইন পাশের পর প্রথমেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালায় পরিবর্তন আনতে বেশ কিছু নতুন প্রস্তাবনা আনা হয়েছিল।
সেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর দেওয়ার বিধানও প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের পর পৌরসভা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন নির্বাচনেরও বিধিমালা চূড়ান্ত করা হবে নতুন আইন অনুযায়ী। সেক্ষেত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতায় একই বিধান বহাল রাখা হবে।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার এ নিয়ে সচিবালয়ে একটি ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শর্ত মানলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অংশ নিতে পারবেন।
কী থাকছে নতুন বিধিমালায়?
বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো নির্দলীয় প্রতীকে। সেই সময় থেকে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো নির্দলীয়ভাবে। ২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন আনে। এরপর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনই দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালে চারটি পৃথক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা নির্বাচন সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। যার মাধ্যমে দলীয় প্রতীক ও দলীয় মনোনয়নে স্থানীয় নির্বাচনের বিধান বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে একই বিধান বহাল রেখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিল পাস হলে নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান চালু হয়।
ওই আইন অনুযায়ী, নতুন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য আলাদা আলাদা বিধিমালা প্রস্তুতের কাজ শুরু করে ইসি। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রথম ধাপেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধিতে সংশোধন আনতে একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
কমিটির প্রধান আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, নতুন বিধিমালায় প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়বে, অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়া যাবে না, স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক শতাংশ সমর্থনের বিধান থাকছে না। এছাড়াও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যবহার করা যাবে না পোস্টার। আগে ইভিএম'র মাধ্যমে ভোট হলেও নতুন বিধিমালায় তা বাদ দেওয়া হয়েছে।
কমিশনার মাছউদ বলেন, নতুন যে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে সেখানে ইভিএমের ব্যবহারও থাকছে না এবং পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানেরও সুযোগ থাকছে না"।
এই নির্বাচন কমিশনার জানান, নতুন খসড়া বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। পরে এ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত নেওয়া হবে এবং আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে ভেটিংয়ের জন্য। পরে চূড়ান্ত করা হবে বিধিমালা।
অংশ নিতে পারবে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা
আগামী অগাস্টে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচনের কর্মযজ্ঞ শুরু করতে সবার আগে স্থানীয় সরকারের এই স্তরের জন্য আচরণ বিধিমালার কাজ চূড়ান্ত করা হয়। ইসি জানিয়েছে, অগাস্টেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন ইসির সাবেক কর্মকর্তা জেসমিন টুলী। তিনি জানান, ‘স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার বিষয়টি তাদের প্রস্তাবনাতেই ছিল। সেটিই আইন আকারে পাশ হওয়ার পর এখন বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’
প্রথমে ইসির কর্মকর্তারা যে খসড়া প্রস্তাবনাটি করেছিল সেখানে একটি বিষয় যুক্ত করা হয়েছিল যে, নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই—এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় সই দিতে হবে। তবে, কয়েক দফা বৈঠকের পর বুধবার যে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে সেখানে এমন কোন বিষয় রাখা হয়নি বলে জানান কমিশনার মাছউদ।
তিনি বলেন, ‘গত সংসদ নির্বাচন যেহেতু একটা ঘটনার প্রেক্ষাপটে হয়েছিল, আমরা রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে অঙ্গীকার করিয়ে নিয়েছিলাম আচরণবিধি মানার বিষয়গুলো। তবে এই নির্বাচনে আলাদা করে কোন অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর করতে হবে না। তবে, হলফনামায় একটি বিষয় যুক্ত করা হবে, সেখানে শুধুমাত্র একটি অঙ্গীকারই থাকবে যে যারাই প্রার্থী হবেন তারা আচরণবিধি মেনে চলবেন।’
ইসির নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চাইলে কী অংশ নিতে পারবে নাকি আইনি কোন বাঁধা থাকবে এমন প্রশ্ন ছিল এই কমিশনারের কাছে। জবাবে মাছউদ বলেন, ‘এটি আমরা দেখবো না সে কোন দল করে। যদি সে ওই পদে নির্বাচনের যোগ্যতা অর্জন করে তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এমনকি তিনি হিন্দু না মুসলমান, ছেলে না মেয়ে, কোন দল করেন নাকি করেন না- সেটি আমরা দেখবো না।’
তিনি আরও জানান, একজন প্রার্থী হওয়ার যে সব যোগ্যতা আছে সেটি যদি থাকে তাহলে সে যে দলেরই হোক তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
মঙ্গলবার সচিবালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, "একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগের হয়েও নির্দলীয় থাকেন তাও পারবেন। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়, এখানে কেউই দলের কথা বলবেন না"।
‘বদলে যেতে পারে ভোটের সমীকরণ’
নির্বাচন কমিশন বলছে, প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ তারপর পৌরসভা এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগও বলছে, এই নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের দলের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আত্মগোপনে থাকা দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, ‘আমাদের দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন তারা যেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়।’
তিনি বলেন, ‘কর্মী সমর্থকদের মধ্যে থেকে এই নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি আছে। অন্যান্য প্রগতিশীল দলগুলোর সাথেও আমাদের আলাপ আলোচনা চলছে। কর্মী সমর্থকদের মধ্যে থেকে আমাদের প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি চলছে।’
তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞা সিদ্ধান্ত তুলে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা না হলেও এরই মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পোস্টার, ব্যানার ফেস্টুন লাগিয়ে অনানুষ্ঠানিক প্রচারণাও শুরু করেছে।
কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে গত ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার অধ্যাদেশটি সংসদে আইন আকারে পাশ হয়। নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে এবার ভোটের হিসাব নিকাশও বদলে যেতে পারে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা তাদের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারেনি। যে কারণে তারা অন্য দলের দিকে ধাবিত হলেও এবার তারা নিজেদের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। এতে বদলে যেতে পারে ভোটের সমীকরণ।’
তার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্দলীয় প্রতীকে হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি নির্দলীয় থাকে না। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন দলীয় রূপই নেয়।
তিনি বলছিলেন, ‘এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য একটা বড় সুযোগ। যদি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে সেক্ষেত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতিতে একটা কামব্যাকের একটা বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।’