বাজেটের ১৪.৬ শতাংশ শিক্ষায়, বেসরকারি স্কুল জাতীয়করণসহ যেসব প্রস্তাব এনসিপির ছায়া বাজেটে
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেছে। দলটির দাবি, জনকল্যাণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য। শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ছায়া বাজেট ঘোষণা করেন দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। এ সময় এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এনসিপির প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৬২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা বেশি। তবে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ০৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশে এবং পরবর্তী অর্থবছরে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, ৫ হাজার কোটি টাকার শিক্ষক মানোন্নয়ন তহবিল এবং ৫ হাজার বেসরকারি স্কুল জাতীয়করণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করে এসএমই ঋণ, যুব উদ্যোক্তা তহবিল এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে।
ছায়া বাজেটে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে প্রথম বছরে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এজন্য বিদ্যুৎ সংযোগের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা, টিআইএন-এনআইডি-ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস সংযুক্তিকরণ, সম্পদ কর চালু, বন্দর ডিজিটালাইজেশন এবং অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বাতিলের মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগ থেকে অতিরিক্ত ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়।
কর কাঠামোয় পরিবর্তনের প্রস্তাব হিসেবে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। নারী ও প্রবীণদের জন্য তা ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে জাকাতকে আয়কর রিবেট হিসেবে স্বীকৃতি, উত্তরাধিকার কর চালু এবং করপোরেট কর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে ২৫ শতাংশ বাজেট বৃদ্ধি করে ৫২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা, দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকি, ময়মনসিংহ ও বরিশালে আন্তর্জাতিক মানের সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ৫০০ নতুন জিপিএস-ট্র্যাকড অ্যাম্বুলেন্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি খাতে আধুনিক শস্য বিক্রয় কেন্দ্র, সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে সার ভর্তুকি প্রদান এবং ফসল সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও পরিবেশ খাতে ‘সোলার এনার্জি সোভারেনটি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় সৌর পণ্যের ওপর আগামী পাঁচ বছর শূন্য শতাংশ করের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ৬ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচির মাধ্যমে এক বছরে ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, ৩ হাজার অফ-গ্রিড গ্রামে সৌর মিনি-গ্রিড স্থাপন এবং ৫০ হাজার ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
নারী ও যুব উন্নয়নে ৫ হাজার কোটি টাকার নারী উদ্যোক্তা তহবিল, স্যানিটারি ন্যাপকিনে শূন্য ভ্যাট, ছয় মাসের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতদের সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।
ব্যাংক খাত সংস্কারে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন, রাষ্ট্রীয় ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠন, ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং পুঁজিবাজারের আকার জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, দেশীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়ন, সরকারি ব্যয়ের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং পোর্টাল চালু, গোপন সম্পদের ওপর বিশেষ কর এবং একটি স্বাধীন বাজেট অফিস প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও ছায়া বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নেতারা বলেন, তাদের ৭১ দফা সংস্কার প্রস্তাব কেবল বিকল্প বাজেট নয়; বরং দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও বিনিয়োগবান্ধব ‘বাংলাদেশ ২.০’ গঠনের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ।