মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেছিলেন দীপেন পরিবারের মনিস্বপন দেওয়ানও, কেন?
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে বারবার পদত্যাগের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসছে। এরই প্রেক্ষাপটে ফিরে এসেছে সাবেক পার্বত্য উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনা, যা এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান দীপেন দেওয়ার পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য মনিস্বপন দেওয়ান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি।
জানা যায়, দায়িত্ব পালনের সময় পার্শ্ববর্তী জেলা খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুঁইয়ার সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে তার বিরোধ ও মতবিরোধ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে এই বিরোধ রাজনৈতিক অস্থিরতার রূপ নেয়, যা তার কাজের পরিবেশকেও প্রভাবিত করে।
একপর্যায়ে মনিস্বপন দেওয়ান উপমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে তিনি দলীয় রাজনীতি থেকেও সরে দাঁড়ান বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তবে পরবর্তীতে তিনি আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হন। দলত্যাগের প্রায় পাঁচ বছর পর তিনি বিএনপিতে ফিরে আসেন এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবেও অংশ নেন।
পদত্যাগের বিষয়ে মনিস্বপন দেওয়ান একসময় দাবি করেছিলেন, তার সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে তিনি দল ছাড়তে বাধ্য হন বলে মন্তব্য করেন তিনি। পার্বত্য রাজনীতির এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনো আলোচনায় রয়েছে নেতৃত্ব, সমন্বয় ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
এর আগে, ১৯৮৯ সালে পার্বত্য অঞ্চলের সংকট সমাধানে গঠিত হয় স্থানীয় সরকার পরিষদ, যা বর্তমানে পার্বত্য জেলা পরিষদ নামে পরিচিত। ওই সময়ে পাহাড়ি-বাঙালি সবার সমর্থনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সাবেক জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ও সংগঠক, দুইবারের পৌর চেয়ারম্যান এবং দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা দীপেন দেওয়ানের ভাই গৌতম দেওয়ান।
তবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন বছরের মাথায়, ১৯৯২ সালে রাঙামাটি শহরে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে ক্ষোভ ও হতাশা থেকে চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন গৌতম দেওয়ান। তার পদত্যাগের মাধ্যমেই পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যানের সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
সর্বশেষ ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন। সরকার গঠনের সাড়ে তিন মাসের মাথায় তাঁর এই পদত্যাগ ঘিরে মন্ত্রণালয় পরিচালনা, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন এবং রাঙামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। যদিও এক বার্তায় দীপেন দেওয়ানের আহ্বান, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পাহাড়ি, বাঙালি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভাই-বোনদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি যে, আপনারা শান্ত থাকুন, ধৈর্য ধারণ করুন এবং আইন-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখুন। কোনো ধরনের উসকানি, বিভ্রান্তি বা সংঘাতের পথে না গিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখুন। আমি বিশ্বাস করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের সবার। এই অঞ্চলের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সকল জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় হোক- এটাই আমার প্রত্যাশা।’
এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির উপজাতি বিষয়ক সহসম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ান নিজের ফেসবুক পোস্টে মন্ত্রীর পদত্যাগ বিষয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি। এ বিএনপি নেতা লেখেন, খুবই দুঃখজনক এই যে, সুপারিশের এই যুদ্ধে আমাদের পূর্ণমন্ত্রী পাহাড়ি বাঙ্গালীর প্রাণ প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোট দিয়ে আমরা যাকে নির্বাচিত করেছি, তিনি হেরে গেছেন! শুধু তাই নয়, তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে। আমি এ বিচারের ভার দেশ প্রেমিক পার্বত্যবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে নিবেদন করলাম।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে এখনও জল্পনা-কল্পনা
এদিকে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে এখনও চলছে জল্পনা-কল্পনা। পদত্যাগ পত্রে তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে দায়িত্ব পালনে অপারগতার কথা জানিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বাস্থ্যগত কারণে দায়িত্ব পালনের অপারগতা দেখিয়ে পদত্যাগের ঘটনা বিরল। সেই দিক থেকে দীপেন দেওয়ানের এই পদত্যাগের ঘটনা ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। তিনি অসুস্থ ছিলেন এটা সত্য। তবে তিনি প্রকৃতই স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেছেন নাকি অন্য কোন কারণ রয়েছে সেটি নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে ঝামেলা চলছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। বিভিন্ন পক্ষের চাপ, সুপারিশ ও তদবির নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছিল। আঞ্চলিক রাজনীতির বিভিন্ন ফ্যাক্টর এবং টাকা পয়সার লেনদেনের মাধ্যমে এসব নিয়োগে মন্ত্রীর উপর প্রবল চাপ ছিল। এছাড়াও ‘রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত মন্ত্রী’র এক ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তার বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডের সমালোচনা ও অসন্তোষ ছিল মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য এলাকায়। অসুস্থ দীপেন দেওয়ান এই চাপ সামলাতে সক্ষম না হওয়ায় অবশেষে পদত্যাগের কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সূত্রে জানা গেছে।