মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করবেন ড. খলিলুর রহমান?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে দেওয়া পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার রক্ষায় তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে রে দাঁড়াতে পারেন বলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন চলছে।
বুধবার (৩ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, ড. খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকবেন কি না সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে যদি নিবেদিতভাবে ওনার এই কাজটা করতে হয় (জাতিসংঘের সভাপতির কাজ) তাহলে ওখানে (জাতিসংঘে) সময়টা দিতেই হবে। তার মানে এই নয় যে, উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এটা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি, এটা ওনাদের দুজনের (প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী) সিদ্ধান্তে হবে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ড. খলিলুর রহমানের এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখছে দল ও সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশের এই উদীয়মান ভাবমূর্তি ধরে রাখতে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ড. খলিলুর রহমানকে পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করতে দিতে চায় সরকার ও বিএনপির হাইকমান্ড। সেজন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে ‘আপাতত’ তাকে সরিয়ে রাখতেও দ্বিধা করবেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারের একটি সূত্র জানায়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে বিজয়কে খুব ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সাফল্য বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা নয় বরং এটি বহুপাক্ষিক কূটনীতি, শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দেশের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক অর্জনের পেছনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সীমিত সময়ে বাংলাদেশের সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতাও মূল ভূমিকা পালন করেছে বলে সরকার মনে করছে।
সূত্র আরও, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় নির্বাচনের জন্য মাত্র তিন মাসের মতো সময় অবশিষ্ট ছিল। সেই সীমিত সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রার্থিতা নিয়ে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে বিজয়ের ব্যাপারে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে কথা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দুজনেই আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ আসছেন।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার (২ জুন) সদস্য দেশগুলোর প্রত্যক্ষ ভোটে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ আসনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পেয়েছিলেন ৯১ ভোট। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন ড. খলিলুর রহমান।
এর আগে, গত ১৩ মে বুধবার বিকালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৮১তম সাধারণ পরিষদের সেশনে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নেন তিনি ড. খলিলুর রহমান। ওই সেশনে দেয়া বক্তব্যেও তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে একজন ‘পূর্ণকালীন প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
লিখিত বক্তব্যে ছয়টি পরিকল্পনার প্রস্তাব তুলে ধরে ড. খলিল জাতিসংঘ সনদ সমুন্নত রাখা, ছোট প্রতিনিধিদলগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐকমত্যের ভিত্তি খুঁজে বের করার চেষ্টার প্রতিশ্রুতি দেন।
সভাপতি নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি সামগ্রিক পদ্ধতির পক্ষে কথা বলবেন। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়নের ঘাটতি, ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ‘ক্ষয়ক্ষতি’ তহবিলকে সমর্থন এবং জীববৈচিত্র্য ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মানবাধিকার ব্যবস্থা সমুন্নত রাখা, মানবিক পরিসর রক্ষা এবং শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের সহায়তার ওপর জোর দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিচক্ষণ ও ন্যায়সংগত শাসনের আহ্বান জানান তিনি। সবশেষে জাতিসংঘের সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।