আসছে যুবদলের নতুন কমিটি, নেতৃত্বে অগ্রগণ্য যেসব নেতা
গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কার্যত স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে বিএনপিসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনে। এবার সেই স্থবিরতা কাটাতে কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে দলটির হাইকমান্ড। সংগঠনগুলো পুনর্গঠনে ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই খবরে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব তৈরি হয়েছে এবং পদ-পদবির জন্য তাদের তৎপরতাও বেড়েছে।
বিশেষ করে বিএনপির অন্যতম অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের পদপ্রত্যাশীদের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়েছে। অনেকেই বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ভূমিকার কথা নানাভাবে বিএনপি হাইকমান্ডসহ নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নূরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে বিগত ২০২৪ সালের ৯ জুলাই বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটির অন্যান্য পদের মধ্যে সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল করিম পল, ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল ও দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সোহেল। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
দীর্ঘ ২২ মাসেও মুন্না-নয়ন নেতৃত্ব কমিটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে যুবদলে পদ প্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশার পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ। সাংগঠনিক পরিচয়হীন অবস্থায় পথে পথে ও প্রভাবশালী নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন পদ প্রত্যাশী নেতারা। ফলে সংগঠনটিতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সৃষ্টি হয়েছে চরম স্থবিরতা। বর্তমান কমিটির নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে দ্রুত নতুন কমিটির দাবি উঠেছে যুবদলে।
যদিও যুবদল নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, চলতি কমিটির বাকী মেয়াদ পূর্ণ করতে হাইকমান্ড থেকে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই আলোকে তারা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে কাজ করছেন। প্রাথমিক ঘোষণার পর ১৫১ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা অনুমোদনের জন্য বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
যুবদলের একাধিক নেতার অভিযোগ, অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়া বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা ইতোমধ্যেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন মিললে যেকোনো সময় কমিটি ঘোষণা হতে পারে। নতুন কমিটি ঘোষণার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দলের নীতিনির্ধারকরা এখনো চূড়ান্ত করেননি।
সূত্রে জানা যায়, তিন ক্যাটাগরিতে যুবদলের নতুন কমিটির নেতৃত্ব বের করে আনা হচ্ছে। এদের মধ্যে বর্তমান কমিটির বিতর্কহীন নির্যাতিত ত্যাগী নেতা, সাবেক ছাত্রদল নেতা এবং দীর্ঘদিন যুবদলে পদ প্রত্যাশী পরিচয়হীন নেতাদের থেকে নতুন কমিটির নেতৃত্ব বের করে আনা হবে।
বিএনপি সূত্র জানায়, দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতীক্ষার পর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার ও বিএনপির সম্পর্ক এখন অনেকটাই সমান্তরাল অবস্থানে পৌঁছেছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ একই সঙ্গে দলীয় রাজনীতিতেও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। বিএনপি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের শীর্ষ পদে রয়েছেন। এতে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে দলটির নীতিনির্ধারক মহল। এমন বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে মন্ত্রী ও এমপিদের সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপির হাইকমান্ড।
দলীয় সূত্র বলছে, নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও গতিশীল করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সরকারের দায়িত্বে থাকা অনেক মন্ত্রী-এমপিকে দলীয় পদ ছাড়তে হতে পারে। একইসঙ্গে বিএনপিতে দীর্ঘদিন আলোচিত ‘এক নেতার এক পদ’ নীতিও কার্যকর হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। সেই প্রেক্ষিতে যেসব নেতা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, তারা কোনো সংগঠনের নেতৃত্বে থাকছেন না, বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত।
যুবদলের বর্তমান আংশিক কমিটি দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় দলের শীর্ষপর্যায়ে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য, বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে সংগ্রাম, ত্যাগ ও নানা চ্যালেঞ্জে যারা উতরে গেছেন তাদের মূল্যায়নের চিন্তা রয়েছে হাইকমান্ডের। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এই দুই শীর্ষ পদে একাধিক সাবেক যুব ও ছাত্রনেতাদের নাম আলোচনায় আসছে।
এসব নেতাদের মধ্যে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসানের নাম আলোচিত হচ্ছে। বিগত সময়ে তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল। নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি রাজনীতির মাঠ ছাড়েননি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা-১৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মামুন হাসান ব্যাপক গণসংযোগ চালান। কিন্তু দল তাকে মনোনয়ন না দিলেও তিনি দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করেননি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাননি। সেক্ষেত্রে তিনি মূল্যায়িত হতে পারেন বলেন সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মোহা. আবু আতিক আল হাসান মিন্টু, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা ও যুবদল সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন ছাড়াও বেশ কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতার নাম আলোচনায় রয়েছে।
আলোচনায় আছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক এবং সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল আহ্বায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েল এবং সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মিরাজ, বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল কবির পল।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নরসিংদী (শিবপুর) আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রতাশী ছিলেন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসা সাবেক ছাত্রদল নেতা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মিন্টু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আন্দোলন সংগ্রামে দলের প্রতিটি কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। সংগঠনকে চাঙা করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। দলীয় আনুগত্য প্রদর্শন করেছি। দলের হাইকমান্ডের কাছে সব তথ্য আছে। হাইকমান্ড অর্থাৎ আমাদের অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তার কোনো ব্যত্যয় হবে না।
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ঘোষিত ২৩৭ প্রার্থীর তালিকায় অন্যতম চমক হিসেবে উঠে এসেছিলেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ। বিএনপি তাকে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। পরে জোটগত কারণে তাকে মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলে দলের সিদ্ধান্ত মেনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন।
কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপযুক্ত ব্যক্তিকেই বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে আনেন। যুবদলের নেতৃত্বের বিষয়েও তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেব।
তিনি আরও বলেন, যুবদলের দায়িত্ব পেলে যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থান, উন্নয়ন, মাদকমুক্ত সমাজ এবং ক্রীড়া-সংস্কৃতির প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করব।
রেজাউল কবির পল বলেন, দল যাকে যোগ্য মনে করবে তাকেই দায়িত্ব দেবে। গত ১৫-১৬ বছর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছি। এখন জনগণকে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করে যাব।
গোলাম মাওলা শাহীন বলেন, আমরা তৃণমূল কর্মী হিসেবে দলের জন্য কাজ করেছি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, আমরা সেটিই গ্রহণ করবো।
যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ও সংগঠনের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মোহা. আবু আতিক আল হাসান মিন্টু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন, যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে যুব সমাজের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। যুবদল হচ্ছে যুব সমাজের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিকে বাস্তবায়নে যুবসমাজকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশ গঠনে আমরা জোরালো এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে অংশ গ্রহণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।
খন্দকার এনামুল হক এনাম বলেন, নতুন কমিটির আলোচনা শুরু হওয়ায় পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে তৎপরতা ও প্রতিযোগিতা বেড়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন, আমরা সেটিই মেনে নেব।
যুবদলের নতুন কমিটি প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমার কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে। তাই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বেড়েছে। যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে এবং সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারা স্থান পাবেন।