১৫ মে ২০২৬, ২০:২২

‘গঙ্গার ন্যায্য পানি না দিলে দিল্লির মসনদ কাঁপিয়ে দেব’— ভাসানীর হুঙ্কার আজও সাহসের প্রতীক

১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের নেতৃত্ব দেন মওলানা ভাসানী  © টিডিসি সম্পাদিত

উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণমানুষের নেতা মজলুম মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ দিবস আগামীকাল শনিবার। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে এই লং মার্চ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও পরিবেশগত আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। ভারতের গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) যে ভয়াবহ পানিশূন্যতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল, তার প্রতিবাদেই ভাসানী এই বিশাল গণযাত্রা করেছিলেন।

পটভূমি ও কারণ
১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ পূর্ণ মেয়াদে চালু করলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পদ্মা নদী ও এর শাখা-প্রশাখায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। নদীর নাব্যতা হ্রাস পায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এর প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তীব্র পানিশূন্যতা এবং তীব্র খরা দেখা দেয়। ফলে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। ধসে পড়ে কৃষি ব্যবস্থা। একই সাথে দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। তৎকালীন আন্তর্জাতিক মহলে এই ইস্যুটি জোরালোভাবে তোলার চেষ্টা করা হলেও খুব একটা ফল পাওয়া যাচ্ছিল না। এই সংকটে দেশের আপামর জনগণকে সচেতন করতে এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে মওলানা ভাসানী লং মার্চের ডাক দেন।

কূটনৈতিক ব্যর্থতা
আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনাগুলোর মাধ্যমে ভারত থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ব্যর্থ হলে মওলানা ভাসানী সরাসরি গণআন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে সকালে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে লাখো জনতার এই পদযাত্রা শুরু হয়। আন্দোলন পরিচালনার সময় মওলানা ভাসানীর বয়স ছিল ৯৩ বছরের কাছাকাছি। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি হুইলচেয়ারে এবং গাড়িতে চড়ে এই বিশাল কাফেলার নেতৃত্ব দেন।

এই লং মার্চের মূল স্লোগান ছিল— ‘গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দাও’। দীর্ঘ ১০০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে মানুষ এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে। ৯৩ বছর বয়সী মওলানা ভাসানী শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে সেদিন ভারতের উদ্দেশ্যে হুঙ্কার দিয়ে বলেন— ‘গঙ্গার ন্যায্য পানি না দিলে দিল্লির মসনদ কাঁপিয়ে দেব’, যা আজও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সাহসের প্রতীক হয়ে আছে।

রাজশাহী থেকে যাত্রা শুরু করে হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে ও বিভিন্ন যানবাহনে করে সীমান্ত অভিমুখে এগিয়ে যায়। ১৬ মে রাতে মিছিলটি প্রেমতলী গিয়ে পৌঁছায়। পরদিন ১৭ মে সকালে মিছিলটি রাজশাহীর গোদাগাড়ী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাটে গিয়ে সমবেত হলেও লং মার্চটির গন্তব্য ছিল ফারাক্কা অভিমুখে। লং মার্চে ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, মজুরসহ সর্বস্তরের লাখো মানুষ যোগ দেন। পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে মানুষ নিজেদের উদ্যোগে নৌকা দিয়ে সেতু তৈরি করে নদী পার হতে আন্দোলনকারীদের সাহায্য করেন।

লং মার্চের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নজরদারি
এই লং মার্চের পর ফারাক্কা সমস্যাটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক পরিচিতি পায়। বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে এই সমস্যাটি জাতিসংঘে উত্থাপন করতে সমর্থ হয়।

জাতীয় ঐক্যের প্রতীক লং মার্চ: দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল স্তরের মানুষকে এক সুতায় গেঁথেছিল এই আন্দোলন, যা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এক অনন্য মাইলফলক।
ঐতিহাসিক দিবস: মওলানা ভাসানীর এই সাহসী পদক্ষেপের স্মরণে প্রতি বছর ১৬ মে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে ‘ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

তাৎপর্য ও প্রভাব
বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ: এই লং মার্চের ফলে ফারাক্কা সমস্যা একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। বিশ্বের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলো একে ‘মরুত্বকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন’ হিসেবে আখ্যা দেয়।
কূটনৈতিক চাপ: এই আন্দোলনের ফলে ভারত সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরে প্রভাব ফেলেছিল।
জাতীয় ঐক্য: এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম কোনো বড় আন্তর্জাতিক সংকটে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অন্যতম উদাহরণ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাইস্কুলে লক্ষ জনতার সমাবেশে রূপ নেয় লং মার্চ

সমাপ্তি ও ভাষণ
১৭ই মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাইস্কুল মাঠে এক বিশাল জনসভার মাধ্যমে মওলানা ভাসানী এই লং মার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। সেখানে মওলানা ভাসানী ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে এক ঐতিহাসিক ও বজ্রকণ্ঠ ভাষণ প্রদান করেন। এই লং মার্চের মূল স্লোগান ছিল— ‘গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দাও’। দীর্ঘ ১০০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে মানুষ এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে। ৯৩ বছর বয়সী মওলানা ভাসানী শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে সেদিন ভারতের উদ্দেশ্যে হুঙ্কার দিয়ে বলেন— ‘গঙ্গার ন্যায্য পানি না দিলে দিল্লির মসনদ কাঁপিয়ে দেব’, যা আজও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সাহসের প্রতীক হয়ে আছে।

প্রতি বছর ১৬ মে বাংলাদেশে ‘ফারাক্কা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়, যা আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং পানির অধিকার রক্ষার লড়াইকে স্মরণ করিয়ে দেয়।