নেপালের তরুণেরা সফল হলেও বাংলাদেশে কেন হোঁচট খেল?
এশিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেন-জি প্রজন্মের একাধিক আন্দোলন হলেও নেপালের মতো তরুণদের সরাসরি শাসনক্ষমতায় যাওয়ার ঘটনা বিরল। তবে ঠিক একইভাবে তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন ঘটিয়েও বাংলাদেশর তরুণেরা এখনো কোনো অর্থবহ রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।
গত মাসে নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক র্যাপার বালেন্দ্র শাহ শপথ নিয়েছেন এবং দেশটির পার্লামেন্টও এখন তরুণ নেতৃত্বে ভরপুর। বাংলাদেশের নির্বাচনের ঠিক এক মাস পর নেপালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চার বছরের পুরোনো দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) বিপুল জয় পায় এবং বেশ কয়েকজন জেন-জি রাজনীতিক পার্লামেন্টে জায়গা করে নেন। আরএসপির সাথে জোট করেই বালেন্দ্র শাহ নেপালের নেতৃত্বে আসেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সফল গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা তরুণদের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। ৩০টি আসনে লড়ে তারা জিতেছে মাত্র ৬টিতে।
নেপালের সাফল্যের কারণ
নেপালের তরুণ নেতাদের মতে, তাদের এই সাফল্যের মূল কারণ ছিল সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে পারা এবং পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কেবল প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আন্দোলনকে একটি নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক রূপ দেওয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাউল উল্লেখ করেন, নির্বাচনে জেতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কাজ প্রয়োজন। কাউল বলেন, ‘যে আন্দোলন মূলত আবেগ, হতাশা, ক্রোধ বা রাজনৈতিক শুদ্ধতার বোধ থেকে উদ্ভূত হয়, তা হয়তো পরিস্থিতির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য ভালো, তবে নির্বাচনে জেতার জন্য তা যথেষ্ট নয়।’ নেপালকে কাউল ‘সাফল্যের একটি ভালো দৃষ্টান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কাউল বলেন, ‘তরুণ আন্দোলন তখনই বেশি কার্যকর হবে, যখন অভ্যন্তরীণ বিভাজন কম থাকবে। বিরোধ ছাড়াই মতাদর্শগত বৈচিত্র্য থাকবে এবং নিজেদের সুবিধায় ব্যবহারের জন্য আন্দোলনের ফলাফলকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠিত দল কম থাকবে।’
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনুপস্থিত ছিল। জেন-জি আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল।
কাউল মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে ‘দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে’ থাকা দলগুলো ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে ‘ক্ষমতাশক্তির বিরুদ্ধে আবেগকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা ভোগ করেছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতাও তরুণদের পক্ষে গেছে। দেশটিতে গত ১৭ বছরে ১৪টি সরকার আসায় প্রতিষ্ঠিত দলগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল। ফলে বিকল্প হিসেবে তরুণদের নতুন দল আরএসপির প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। এ ছাড়া নতুন দল হিসেবে হুট করে নির্বাচনে না নেমে শক্তিশালী দলীয় কাঠামো গড়ে তোলা এবং জনপ্রিয় নেতা বালেন্দ্র শাহর সাথে জোট করাও তরুণদের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ:
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে একটি দলের আধিপত্য থাকায় পরবর্তী অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠিত দলগুলোই ভুক্তভোগী হিসেবে মানুষের সেন্টিমেন্টের সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে। ফলে তরুণ দলগুলোর চেয়ে তারাই বিক্ষোভের শক্তিকে ভোটে রূপান্তর করতে বেশি সক্ষম ছিল।
এছাড়া বিতর্কিত ও রক্ষণশীল দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে এনসিপির জোট করার সিদ্ধান্তটিও তাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়েছিল। দিল্লির এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ঋষি গুপ্ত বলেন, ‘বাংলাদেশে রক্ষণশীল শক্তির সাথে জোট বেঁধে এনসিপি জেন-জি আন্দোলনের চেতনার চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার দিকে বেশি মনোনিবেশ করেছিল। এতে সাধারণ ভোটার ও নারী সমর্থকদের একটি বড় অংশ তাদের থেকে দূরে সরে যায়।’
পাশাপাশি আন্দোলনের প্রায় দেড় বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াকেও গতিরোধের আরেকটি কারণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হতাশা এবং পরবর্তী লক্ষ্য
সরাসরি ক্ষমতায় যেতে না পারলেও বাংলাদেশের তরুণ আন্দোলনকারীরা জাতীয় আলোচনার ধারা বদলে দিতে পেরেছেন। যার ফলে সংবিধান ও আইনি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে নতুন সরকারের কর্মকাণ্ডে তরুণদের মাঝে তীব্র হতাশা ও মোহভঙ্গ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের তরুণ আন্দোলনকারী উমামা ফাতেমা বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি ভীষণ হতাশ হয়েছি। নেপালের তরুণেরা যেভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছে, তা দেখে নিজের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ না হয়ে পারিনি।’
তিনি জানান, দেশের তরুণদের মাঝে আবারও ব্যাপকভাবে বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
তবে উভয় দেশের তরুণ নেতারাই জানিয়েছেন, লক্ষ্য অর্জনে তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন। নেপালের তরুণ এমপিরা নিজের দলের বিরুদ্ধে হলেও দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান ধরে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের এনসিপি নেতা রাহাত হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নতুন সরকার গণভোটের ফলাফল মেনে না চললে তারা আবারও রাজপথে আন্দোলনে নামবেন। উমামা ফাতেমা মনে করেন, বাংলাদেশের পরবর্তী আন্দোলনের ধাপকে হয়তো নেতৃত্ব দেবে 'জেনারেশন আলফা'।