আপনাদের ম্যানিফেস্টো পড়ে কয়জন ভোট দিয়েছে, বিএনপিকে আখতারের প্রশ্ন
সরকারি দল বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, জনগণকে তারা আজকে বলে জুলাই সনদ পড়ে নাই, সেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার কথা বলা হয়। তিনি বলেন, যেই জনগণ জুলাই সনদে ভোট দিয়েছে, ওই জনগণ তো সরকার নির্বাচনের জন্য ভোট দিয়েছে। তাহলে আপনাদের ম্যানিফেস্টো পড়ে কয়জন ভোট দিয়েছে, সেই প্রশ্নটা আমরা করতে চাই।
আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আনীত জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশের অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধানের সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা চলাকালে এসব কথা বলেন তিনি।
আখতার হোসেনের পুরো বক্তব্যটি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল—
আমরা কোন প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে আজকের এই সংসদে এসেছি, আমরা সকলেই সেটা জানি। সেই প্রেক্ষাপট যখন বাংলাদেশে সংগঠিত হল, তারপরে ৫ আগস্ট থেকে নিয়ে ৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন সরকার ছিল না। সেই সময়টাতে বাংলাদেশের সংবিধান কতটুকু কার্যকর ছিল? সেই ব্যাপারে কি আমরা খোঁজখবরটা রেখেছি?
আমরা একটা জিনিস স্পষ্ট করে বলতে চাই। আমাদের এখানে বর্তমানে যিনি আইনমন্ত্রী আছেন, তিনি যে তখন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেলেন, কোন সংবিধানের বদৌলতে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেলেন সে প্রশ্নটা কি আমরা ভুলে গিয়েছি? যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণ করেছে, বাংলাদেশের সংবিধানের কোথাও এর কোনো বর্ণনা নেই। আগের সরকার, তারা যে পদত্যাগ করেছে, সেই পদত্যাগের ফর্মুলা কী? সংসদ যে ভেঙে দেওয়া হল ৬ তারিখে, সেই সংসদ ভেঙে দেওয়ার ফর্মুলাটা কী সংবিধানে বর্ণনা করা ছিল? তার কোন কিছুই সেই সময়টাতে সংবিধান অনুযায়ী হয় নাই।
কারণ সেই সময়টাতে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে, হাজারও মানুষের জীবনের মধ্য দিয়ে নতুন এক বাংলাদেশের প্রত্যয়ে জনগণের অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছিল। সেই সময়টাতেই যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় তাদের হাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের এই রাষ্ট্র কাঠামোটাকে সংস্কার করা। বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোকে সংস্কার করার যে প্রয়োজনীয়তা, আমরা এটা অতীতে দেখেছি, রাষ্ট্র কাঠামোকে বারংবার একটা ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে সেটাকে পৃষ্ঠ করা হয়েছিল।
সেই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়টাতে ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। সেই ঐকমত্য কমিশনে আমরা ৩০টির অধিক রাজনৈতিক দল এবং জোট দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ সেখানে আলোচনা করেছিলাম। সেই আলোচনার এক প্রান্তে গিয়ে যখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ আসে সেটা নিয়ে আমরা কয়েক দফায় আলোচনা করেছি। সেই আলোচনায় আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন সাহেব সেখানে উপস্থিত ছিলেন, জুনায়েদ সাকি ভাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন, সেখানে নুরুল হক নুর ভাই উপস্থিত ছিলেন, শাহাদাত হোসেন সেলিম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এতগুলো মানুষ, সরকারি দলের বেঞ্চে তারা বসে আছেন, তারা ঐকমত্য কমিশনে উপস্থিত হয়েছিলেন। ঐক্যমত্য কমিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে সকলের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনার প্রসঙ্গ তারা সংসদে এসে কিভাবে ভুলে গেলেন সেটা আমি তাদের কাছে জানতে চাই।
৫ অক্টোবর আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, গণভোট জনগণের তরফ থেকে যে রায় আসবে সেই রায় সংসদের প্রত্যেকজন সদস্যকে মানতে হবে। তিনি তার কথার ওপরে এখন অটল কেন নাই সেটা আমরা তাদের কাছ থেকে জানতে চাই। আমরা এই কথাটাও জানতে চাই, আইনমন্ত্রী সে সময়টাতে এই সংবিধান সংস্কারের জন্য যে আদেশ সেটাকে বাস্তবায়নের জন্য যে এক্সপার্ট প্যানেল গঠন করা হয়েছিল, সেই এক্সপার্ট প্যানেলের তিনিও একজন মেম্বার ছিলেন। তিনিও পরামর্শ দিয়েছিলেন সেই এক্সপার্ট প্যানেলে কেমন পদ্ধতিতে জুলাই সনদকে বাস্তবায়ন করা হবে। আজকে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে তিনি যখন স্বরাষ্ট্র আইনমন্ত্রী হয়েছেন, তখনই এসে তিনি তার পজিশনটাকে পরিবর্তন করে এখন তিনি সবকিছু বেমালুম ভুলে গিয়েছেন।
আজকে তারা এসে হবস, লক আর রুশো পড়ার কথা বলছেন। আমার তো মনে হয় হবস, লক আর রুশো পড়ার মধ্য দিয়ে তারা অতীতে যে নৈতিকতার পাঠ, সেই নৈতিকতার পাঠটা তারা ভুলে গিয়েছেন। যদি নৈতিকতার পাঠ তাদের থাকত তাহলে এতগুলো জনগণের সামনে তারেক রহমান, আমাদের প্রধানমন্ত্রী, তিনি ৩০ জানুয়ারি রংপুরে আবু সাঈদের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দয়া করে গণভোটে হ্যাঁ দিন। দয়া করে গণভোটে হ্যা দেওয়ার কথা বলে তারা এখন এসে গণভোটের রায় মানতে কেন চান না? সেই প্রশ্নটা আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে করতে চাই।
আমরা আরো স্পষ্ট করে আপনার মাধ্যমে জানতে চাই যে আদেশ জারি করা হয়েছে, সে আদেশটা নাকি আইন নয়। এমন ধরনের বক্তব্য এখানে উপস্থাপন করা হয়। অথচ বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫২ নম্বর আর্টিকেলের মধ্যে একটা আদেশও যে আইন হতে পারে, সেই ব্যাপারে সেখানে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। তারা বলছেন, আদেশ তো আইন নয়, অসাংবিধানিক। এটা ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য। জনগণ যেখানে গণভোটের মধ্য দিয়ে এই আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে, সেখানে জনগণের রায়কে অসাংবিধানিক বলা এই সংসদকে কলঙ্কিত করে।
আমরা স্পষ্ট করে আরেকটা জিনিস আপনাকে বলতে চাই। যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, সে অধ্যাদেশের ব্যাপার নিয়ে একটা আলাপ এখানে উঠেছে যে সে অধ্যাদেশটা কে এই সংসদে সেটাকে এপ্রুভ করা হবে কি হবে না? সেই অধ্যাদেশ এই সংসদে এপ্রুভ করা হোক আর না হোক, ফ্যাক্ট ভ্যালু অনুযায়ী, সেই অধ্যাদেশ অনুযায়ী যে গণভোট হয়েছে, সেই গণভোট যে বৈধ সেই গণভোটকে অবৈধ বলার কোন সুযোগ নাই। আমরা আরেকটা কথা বলতে চাই যে অধ্যাদেশের কথা আপনারা বলছেন, অধ্যাদেশগুলো এই সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে, সে অধ্যাদেশের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে আদেশ সে আদেশটাকে রেফার করা হয়েছে। আপনারা অধ্যাদেশটাকে এখানে রেফার করবেন, আবার অধ্যাদেশের মধ্যে যে আদেশের কথা বলা হয়েছে সেটাকে আপনারা বেমালুম চেপে যাবেন। এই ধরনের দ্বিচারিতা বাংলাদেশের সংসদে যদি আপনারা করেন, জনগণ আপনাদেরকে ছাড় দেবে না।
যে আদেশের ব্যাপারটা নিয়ে বলা হয়, সে আদেশ যেই ১৩ নভেম্বর জারি করা হল, সেইদিন সালাহউদ্দিন সাহেব ব্যক্তিগতভাবে আদেশের ব্যাপারে তার আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেইদিন রাতের বেলা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মিটিং করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে যে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিল, সেই সংবাদ সম্মেলনে আদেশ জারির দিনে বিএনপি দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে তৎকালে প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল। কোন স্বার্থে সেদিন ধন্যবাদ জানিয়েছিল? আমরা সে বিষয়টা তাদের কাছ থেকে জানতে চাই।
জুলাই সনদের মধ্য দিয়ে আমরা কি চেয়েছি? আমরা চেয়েছি এমন একটা বাংলাদেশ যেই বাংলাদেশে আগের মত করে সরকারি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ হবে না। আপনারা যদি নতুন বাংলাদেশের কথা বলেন, আপনারা কি আবার আগের মত করে নুরুল হুদার মত একজনকে নির্বাচন কমিশনার বানাতে চান? নাকি আপনারা সেই ২০০১ থেকে ২০০৬ এর মত আপনাদের মত করে সংবিধান সংশোধন করে কেএম হাসানের মত একজনকে আপনারা যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে এসেছিলেন, তারপরে ১৭টা বছর বাংলাদেশকে যে সাফার করতে হয়েছিল, সেই ইতিহাসগুলো যে আপনারা ভুলে গিয়েছেন সেটা আমাদের কাছে বড়ই দুঃখ লাগে।
আমরা একটা কথা বারংবার আপনাদের কাছে বলি, ৯০-এর পরে তিন জোটের রূপরেখা আপনারা সহজে মানতে চান নাই। কিন্তু জনগণ যখন রাজপথে নেমে এসেছিল আপনারা কিন্তু তখন মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমরা জানি নির্বাচনের আগে আপনারা যখন জনগণের কাছে গিয়েছিলেন, আপনারা গণভোটের কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। আপনারা এই কারণেই বাধ্য হয়েছিলেন, নতুবা জনগণ সে সময় এটাতে যে সিদ্ধান্ত নিত সেই সিদ্ধান্ত আপনাদের ফেভারে নাও যেতে পারত। সেই জনগণকে তারা আজকে বলে জুলাই সনদ পড়ে নাই, সেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার কথা বলা হয়। যেই জনগণ জুলাই সনদে ভোট দিয়েছে, ওই জনগণ তো সরকার নির্বাচনের জন্য ভোট দিয়েছে। তাহলে আপনাদের ম্যানিফেস্টো দেখে কয়জন ভোট দিয়েছে, সেই প্রশ্নটা আমরা করতে চাই।
আপনাদের কাছে একটাই মাত্র চাওয়া, এটাতে আইনগত কোন বাধ্যবাতকতার জায়গা নেই। বিএনপির সদিচ্ছার বিষয়, সরকার দলের সদিচ্ছার বিষয়ে তারা টু-থার্ড মেজরিটি পেয়েছেন, তারা যদি আজকে সদিচ্ছা প্রকাশ করেন যে জুলাই সনদ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ গণভোটকে তারা মেনে নিবেন, এটা নিয়ে আর কোন প্রশ্ন কোথাও উঠবে না।