স্মৃতিসৌধে নাহিদ পেছনের সারিতে, সমালোচনা
মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম পেছনের সারিতে থাকাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
এসময় তার সঙ্গে নাহিদ ইসলাম ছাড়াও জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সেসময়ের টেলিভিশন ফুটেজগুলোতে দেখা যায়, পুস্পস্তবক অর্পণের আগে স্মৃতিসৌধের সিঁড়িতে অবস্থান করছিলেন ডা. শফিকুর রহমান, নাহিদ ইসলামসহ অন্যরা। পরে ডা, শফিকুর রহমানসহ জমায়াত নেতারা বেদির দিকে এগিয়ে যান। পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় নাহিদ ইসলাম পেছনে পড়ে যান। জামায়াত আমিরের ডানে বামে অবস্থান করছিলেন এটিএম আজহার, মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ বাকি নেতারা। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে মোনাজাত শুরু করেন জামায়াত আমির। এসময় পিছনে জামায়াতের নেতার তার সঙ্গে সামনের সারিতে অবস্থান করছিলেন। আর নহিদ ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম মাসুদ পিছনের সারিতে দাঁড়িয়ে মোনাজাতে অংশ নেন।
বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনা ও পালটাপালটি আলাপ দেখা গেছে। কারও মতে, নাহিদ ইসলামকে পেছনে রাখা প্রোটকলের বাইরে গিয়ে তাকে অবমূল্যায়ন ও মর্যাদাহানি করা হয়েছে। আবার কারও মতে, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করেছেন তিনি।
নাঈম আবেদিন নামের একজন লিখেছেন, সম্মানিত মানুষকে সম্মান দিলে মান কমে না বরং বাড়ে। আমার ভাই নাহিদ ইসলাম-এর চেহারার মতোই অন্ধকার নেমে আসবে আপনাদের উপর। নাহিদ ইসলাম-এর সামনে যেই ৬-৭ জন দাঁড়ায় ছিলেন, আমিরকে বাদে একজন দেখান, যিনি পদে, গুণে মানে নাহিদ ইসলাম থেকে বেশি ভাইব্র্যান্ট। নাহিদ ইসলাম আমাদের শুধু নেতাই না। নাহিদ ইসলামকে আমরা দেখি "জুলাই বিপ্লবের" মুকুট হিসেবে। মুকুট কে মাথায় না রাখলে আপনাদের রাজ্য নড়বড়ে করে দেবে প্রজারাই।
ইবতিদিয়া নামে অন্য একজন লিখেছেন, ভিডিও দেখে তো মনে হচ্ছে নাহিদ ইসলাম নিজেই সিনিয়রদের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিল।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আলম তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, নাসির ভাইয়ের পেছনে দৌঁড়ানো আবেগি কর্মী অন্তত নিজের দলের সাধারণ সম্পাদকের পেছনেই দৌঁড়ায়। তাকে নিয়ে আইরনি করা লোকজনের নেতা দাঁড়ায় অন্য দলের নেতার পেছনে। আইরনি কোনটা আসলে?
জাতীয় ছাত্রশক্তির নেত্রী আনিকা তাহসিনা তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, জামাতের ২৬ মার্চে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘটনা হাস্যরসে পরিণত হতো পেছনে দাঁড় করানো জুলাইয়ের প্রধান নেতা নাহিদ ইসলাম তাদের সাথে না থাকলে।
কী ঘটেছিলো পুষ্পস্তবক অর্পণের সময়?
সেসময় উপস্থিত জামায়াত নেতা ও পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কোনো ভুলভ্রান্তি হয়েছে বা আমাদের মধ্যে এটা কোনো মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং ব্যাপারটা এরকম না। আসলে কেউ কখনো সামনে পড়ে গেছে, কেউ কখনো পিছে পড়ে গেছে, এটা হয়ে গেছে আরকি।
তিনি আরও বলেন, এটা বলতে পারেন যে কিছুটা কাকতালিয়ভাবে হয়ে গেছে। এটা ইনটেনশনালি কিছু হয়নি। কখনো কখনো বিরোধী দলের নেতার সাথেও ছিল নাহিদ ইসলাম। কখনো হয়ত হাঁটতে গিয়ে পিছনে পড়ে যাওয়ার কারণে হয়ে গেছে। উনি কিন্তু একদম মানে বিরোধী দলের নেতার সাথে হাঁটছেন, সামনে আছেন সেটার ছবিও আছে।
তিনি আরও বলেন, তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এমন কোনো বিষয় না। সম্মানের সাথে, আন্তরিকতার সাথেই সবসময় এগুলো মেনটেইন করার চেষ্টা করি এবং সেটা ভবিষ্যতেও থাকবে। আমার মনে হয় না যে আমাদের কোনো মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং অথবা ইনটেনশনালি এখানে কিছু হয়েছে, সেরকম কিছুই হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নারী শক্তির আহ্বায়ক ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কেন সে পিছনে দাঁড়িয়েছে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে। আমি জানি না যে ওখানকার পরিস্থিতি কী ছিল, পরিস্থিতি না জেনে আসলে বলা সম্ভব না।
তিনি আরও বলেন, আসলে এঘটনায় যারা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, এটা স্বাভাবিক। নাহিদ ইসলাম একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, সেই জায়গা থেকে তাকে পেছনে দেখে স্বাভাবিকভাবেই সে দলের নেতাকর্মীদের ডিমোটিভেটিং লাগছে। উনি দলীয় চিফ, একজন এমপি, স্বাভাবিকভাবেই সামনে রাখার কথা ছিলো, এটা সৌন্দর্যের বিষয়।
মনিরা শারমিন বলেন, বোঝা যাচ্ছিল না যে আসলে নির্বাচিত যারা প্রতিনিধি তাদের পুষ্পস্তবক অর্পণ নাকি শুধু জামায়াতে ইসলামের দলীয় পুষ্পস্তবক অর্পণ। একরকম কনফিউশনের মধ্যে আসলে সবাই পড়ে গেছে। আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, তাদের নিজেদের পুষ্পস্তবক প্রদান ছিলো। সেখানে দেখা গেছে অনির্বাচিত যারা ছিলো তারাও সামনে ছিলো।
তিনি আরও বলেন, একটা ডেকোরাম অবশ্যই থাকা উচিত, কে কোথায় দাঁড়াবে। যখন আমরা দলীয় ভাবে কোথাও ফুল দিতে যাই, কে কোন পাশে দাঁড়াবে এটা কিন্তু ঠিক করা থাকে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে দাঁড়ানোর প্রটোকল বা ডেকোরাম আছে কি?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গণতন্ত্র চর্চা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, বিরোধী দল যদি সবাই মিলে ফুল দেওয়া হয়, তখন তো অবশ্যই নাহিদকে পাশে রাখতে হবে। আর যদি বিরোধী দল আলাদা আলাদা করে ফুল দেয়, তখন নাহিদ পিছনে আছে, নাহিদ পিছনে ফুল দেবে— এটা এভাবে হতে পারে। এগুলো কোথাও লিখিত নাই, এগুলো প্র্যাকটিস।
তিনি আরও বলেন, যদি এমন হয় যে, দল থেকে ফুল দেওয়া হয়েছে, তখন যদি নাহিদকে পেছনে রাখা হয় তাহলে একটা বিষয়। আর যদি সবাই একসাথে দেয় তখন আরেকটা বিষয়। নাহিদের দলে তিনটা সিট হোক বা দশটা হোক, তাকে সাথে নিয়ে শ্রদ্ধা জানানো উচিত, যদি বিরোধী দলের কনসেপ্ট থেকে যাওয়া হয়। আর জামায়াত ইসলামী, এনসিপি আলাদা শ্রদ্ধা জানালে, সেটা আলাদা বিষয়, কে আগে পরে সেটা বিষয় না।