১৭ বছরের সংগ্রাম, দেশনেত্রীর মৃত্যুর দিনে বহিষ্কার, অবশেষে মুখ খুললেন রুমিন ফারহানা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের আংশিক) থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কার প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি জানান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেদিন ভোরে মারা যান, সেদিনই বিকেলে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়; ১৭ বছর দলটির হয়ে লড়াই করার পরও কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর তিনি পাননি।
ত্রয়োদশ সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বহিষ্কারের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক তাকে ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ তাকে অনেক ভালোবেসেছে। এর জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘অনেক।’
‘আমরা এটাও দেখলাম যে ১৭ বছর ধরে যেই বিএনপির হয়ে আপনি একাই ১০০টির মতো সংসদ অধিবেশনে ফাইট দিয়ে গেলেন। সেখানে আপনাকে বিএনপি থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো এবং তারপরে বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে নিজে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করা- এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে রুমিন বলেন, আমি আপনাকে বলি, এ জয়টা আমি আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি। আমি আল্লাহকে শুরুতে একটা কথাই বলেছি- আল্লাহ আমাকে লজ্জিত করবেন না। আপনি আমাকে অপমানিত করবেন না। কারণ আমার নিয়ত কেউ জানে না। আপনি জানেন। '
'আমি কেন এমপি হতে চেয়েছি, জানেন? আমি তো অনেক সহজেই সংরক্ষিত কোটায় সংসদে যেতে পারতাম কিংবা বার্গেইনে গিয়ে মন্ত্রীও হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু আমি কেন মর্যাদার লড়াই লড়ছি- এটা আল্লাহ জানেন। তাই আমি স্রষ্টার কাছে বলেছি, আপনি (আল্লাহ) আমাকে লজ্জিত করবেন না। নির্বাচনের দিন পুরোটা সময় রেজাল্ট বের হওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি অনবরত আমি দোয়া পড়েছি। পুরো ইলেকশন সময়টা আমি দোয়া পড়েছি। দরুদ পড়তাম সারাক্ষণ।'
রুমিন বলেন, 'আমি বিএনপি কাছে ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ; দলটি আমাকে মনোনয়ন দেয়নি। না দেওয়ার ফলে আমি আপামর মানুষের দোয়ার অংশ হয়ে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের নারীরা বিশেষ করে যে যেই দল করেন; যে যেই মতের হন- তারা আমার জন্য দোয়া করেছেন। এ অপমানটা (আমাকে বহিষ্কার) তাদের সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। '
তিনি বলেন, 'ভোটের আগে আমি যেখানেই যেতাম খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের সঙ্গে সখ্য হয়ে যেত। ওনাদের সঙ্গে আসলে আমার রিয়েল কানেকশন বা প্রকৃত সখ্য গড়ে উঠেছে। আমি নিজেও খুব সাধারণ এবং সে কারণেই সম্ভবত আমি খুব বড় পদ বা বড় বড় মানুষদের সঙ্গে আমি ওভাবে সংযোগ স্থাপন করতে পারি না। ধরুন আমি একটি শপিং মলে গেলাম- আমি হয়তো ওয়াশরুমে গেছি। যিনি ক্লিন করেন ওয়াশরুম- উনি বলছেন ওই যে হাঁস আপা আসছে। আপনার জন্য কত দোয়া করছি আপা। আমি সারা বাংলাদেশের কাছে কৃতজ্ঞ।'
১৭ বছর নিবেদিতভাবে সার্ভিস দেওয়ার পরও কেন মনোনয়ন দেওয়া হয়নি এবং বহিষ্কার করা হয়েছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'প্রথমত এটার উত্তর আমার জানা নাই। একদম সঠিক উত্তর কেবলমাত্র যারা মনোনয়ন দিয়েছেন তারাই বলতে পারবেন। দুই হচ্ছে, আপনি শুরুতে একটি প্রশ্ন করেছিলেন যে আপনি তো অলমোস্ট একাই বিএনপিকে ১৭ বছর মিডিয়াতে অন্তত বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। হয়তো অতি আবেগীয় সিদ্ধান্ত ছিল। যেটা একই সঙ্গে বিভিন্ন মানুষকে বিরক্তও করেছে। যাদের বিপক্ষে বলেছি তাদেরও হয়তো একসময় এই ভারটা অসহ্য মনে হয়েছে।'
‘আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনেক ওয়াইজ অ্যাক্ট করছেন সোশ্যাল মিডিয়াতে। আমরা সবসময় তাকে এভাবেই দেখি। উনি তো দেখেছেন কারা আমাদের (বিএনপি) জন্য ফাইট করেছেন। তিনিই বলতে পারবেন আমি কেন বহিষ্কৃত।'
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্নেহধন্য হওয়া সত্ত্বেও এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো—এমন প্রশ্নে রুমিন বলেন, 'এটা তো তাহলে আপনার ওয়াইজ প্রাইম মিনিস্টরকে জিজ্ঞেস করা উচিত।'
উপস্থাপক জানতে চান, বহিষ্কারের খবর কীভাবে পেয়েছিলেন। জবাবে রুমিন বলেন, 'নিউজপেপারে আমি দেখেছি। ওইদিন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ভোরে মারা যান। আমি বিকাল ৫টার দিকে নিউজে দেখলাম যে আমি বহিষ্কৃত। যদিও তখন দলীয় এবং রাষ্ট্রীয় শোক চলছে; সাধারণত যখন শোক পালন করা হয়- তখন পারিবারিক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত- এ ধরনের সিদ্ধান্ত তো দূরেই থাক ও প্রতিদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও আমরা বন্ধ রাখি। কিন্তু তারা সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। '
নতুন সংসদ নিয়ে অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'অভিজ্ঞতা খারাপ ছিল না। তবে আমাদের আগের সংসদগুলো যে রকম- ওয়ান থার্ড অব দ্য পিপুল বা অ্যাটলিস্ট হাফ অব দ্য পিপুল বাইরে রেখে সংসদ চলেছে; এবার আমার কাছে মনে হয়েছে- অ্যাটলিস্ট ওয়ান থার্ড অব পপুলেশনকে বাইরে রেখে এ সংসদ গঠিত হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের মতো বড় দল এবং বাম দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। দুই. দীর্ঘদিনের অনভ্যস্ততায় বেশ কিছু জায়গায় ছোটখাট ভুল হচ্ছিল। যেগুলো না হলে আরেকটু ভালো হতো হয়তো। কারণ এখানে বেশিরভাগই নতুন একদম ফ্রেশ মানুষ। যারা প্রথমবারের মতো সংসদে গেছেন; অনেকে আছেন দীর্ঘ সময় সংসদের বাইরে ছিলেন; তাই আমার মনে হয়েছে সবকিছু খাপ-খাইয়ে নিতে আরেকটু সময় লাগবে।'