রাষ্ট্রপতিকে ‘অসম্মান জানাতে’ আগেই বসেছিল বিরোধীদল, হাসনাতের ইঙ্গিতে দাঁড়ান এমপিরা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতির মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের প্রবেশের ঘোষণা আসতেই শুরু হয় হট্টগোল। প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে প্রতিবাদ জানান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। প্রায় ১০ মিনিট পর রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করে ভাষণ শুরু করলে স্লোগান দিতে দিতে ওয়াক আউট করেন তারা।
ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাষ্ট্রপতি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকা বিরোধী দলীয় সাংসদরা বসে পড়েছিলেন। এ সময় জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া শুরু হলেও সাউন্ড সিস্টেমে ত্রুটির কারণে বিষয়টি বুঝতে দেরি হয় তাদের।
নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের পর এবং বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিয়ে থাকেন। প্রটোকল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ এবং বের হওয়ার সময় দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর নিয়ম রয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করলে সরকারদলীয় এমপিরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান।
এর আগে ৩টা ৩০ মিনিটের দিকে স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির ভাষণের জন্য নাম ঘোষণা করেন। এ সময় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। এতে কক্ষে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সংসদ সদস্যদের হাতে বিভিন্ন লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়। প্রায় ১০ মিনিট পর রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করলে তারা বসে পড়েন।
এর প্রায় এক-দেড় মিনিট পর জাতীয় সঙ্গীত বেজে ওঠে। তবে ওই সময়ের রেকর্ডেড ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রথম উঠে দাঁড়ান। ওই সময় একমাত্র হাসনাত আব্দুল্লাহর কানে হেডফোন লক্ষ্য করা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসনাত আব্দুল্লাহর কানে হেডফোন থাকায় তিনি জাতীয় সঙ্গীত শুরু হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন। কিন্তু সে সময়ে কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম কাজ না করায় অন্য সাংসদরা বুঝতে পারেননি। হাসনাতের ইশারার পর জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারাও উঠে দাঁড়ান।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে ওই সময়ে অধিবেশন গ্যালারিতে উপস্থিত দৈনিক সমকালের সাংবাদিক রাজীব আহাম্মদ লিখেছেন, ‘আজ সংসদের অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড খুবই খারাপ ছিল। সংসদ সচিবালয়ে বলছে, ৫ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত সাউন্ড সিস্টেম মেরামত করা হলেও, পুরোপুরি ঠিক হয়নি। এ কারণে টিভিতে, ফেসবুকে, অনলাইনে সম্প্রচারের সময় ভাষণ শোনা গেলেও, অধিবেশন কক্ষে ও গ্যালারিতে প্রায় শব্দ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে আজ ২০ মিনিট অধিবেশন বন্ধ ছিল। মাঝের দুই সারিতে মাইক পুরোপুরি অকেজো থাকায়, এমপিদের উঠে গিয়ে অন্যয় আসন থেকে ভাষণ দিতে হয়েছে।’
তিনি লিখেছেন, ‘একই অবস্থা হয়েছিল জাতীয় সঙ্গীতের সময়। রাষ্ট্রপতি যখন সংসদে প্রবেশ করেন, তখন বার্তাবাহক মাইক ছাড়াই আগের দিনের রাজা বাদশার আগমনের মত উচ্চস্বরে ঘোষণা দেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি আসছেন— এ ঘোষণা শুনে সব এমপি উঠে দাঁড়িয়ে সম্মাণ। এটাই সংসদীয় রেওয়াজ। বিরোধীজোটের এমপিরা তখন দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে সম্মান না জানানোর সিদ্ধান্ত থেকে তারা বার্তাবাহকের খালি গলার ঘোষণা শোনামাত্র বসে পড়েন। রাষ্ট্রপতি এসে দাঁড়ানো মাত্র জাতীয় সঙ্গীত বাজানো শুরু হয়। টিভিতে-অনলাইনে তা শোনা গেলেও, অধিবেশন কক্ষে বাজছিল না। গ্যালারিতেও না।’
সাংবাদিক রাজীব আহাম্মদ আরও লিখেছেন, ‘হাসনাতের কানে হেডফোন থাকায় বুঝতে পেরে ইশারা দেয়, জাতীয় সঙ্গীত চলছে। তখন সবাই উঠে দাঁড়ায়। আর সরকারি জোটের এমপিরা রাষ্ট্রপতির আগমনের কারণে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক মিনিটের জাতীয় সঙ্গীতের শেষ দিকে এসে, অধিবেশন কক্ষ ও গ্যালারিতে তা শোনা যায়। তখন সাংবাদিক ও দর্শকরাও উঠে দাঁড়ান। এই হল ঘটনা। খেয়াল করলে দেখবেন, সাউন্ডের ত্রুটির কারণে প্রধানমন্ত্রী আজ প্রায় পুরো সময় কানে হেডফোন ধরে ছিলেন।’