ক্ষমতা হস্তান্তরের পর নীরব যমুনা, কোথায় গেল সেই বিক্ষোভ—প্রশ্ন শফিকুল আলমের
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে সংজ্ঞায়িত করে দেওয়া যে বিক্ষোভগুলো ছিল, সেগুলো যেন হঠাৎ করেই বাতাসে মিলিয়ে গেছে বেদনাদায়ক বিদ্রূপের মতো। যমুনায় হামলা চালানোর চেষ্টা নেই, গেটের সামনে বধির করে দেওয়া স্লোগানের গর্জন নেই, নেই হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন উদয় হওয়া অচেনা গোষ্ঠীগুলোর আকস্মিক তৎপরতা।
বুধবার মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুল আলম জানান, আমি কতবার সহকর্মীদের নিয়ে আন্দোলনরতদের কাছে গিয়ে হাতজোড় করে অনুরোধ করেছি, ‘দয়া করে সরে যান’ তার হিসাবই হারিয়ে ফেলেছি। তারা খুব কমই আমাদের কথা শুনেছে। এখনও স্পষ্ট মনে আছে, একটি সরকারি প্রকল্পের এক নারী কর্মকর্তা আমাদের হুমকি দিয়েছিলেন—যদি তাকে অবিলম্বে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে তিনি যমুনার গেট ভেঙে ফেলবেন। কার্যত তিনি আমাদের জিম্মি করে ফেলেছিলেন।
সাবেক প্রেস সচিব বলেন, কিছু গোষ্ঠী তাদের সমাবেশের ঘোষণা দিত, আবার কেউ কেউ আকস্মিক বন্যার মতো এসে হাজির হতো। আমাদের পুলিশ কর্মকর্তারা তখন চরম বিভ্রান্তিতে পড়তেন, তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছিল। তারা এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে আটকে ছিলেন—একটি লাঠির আঘাতও যদি পড়ত, সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়ে যেত। জুলাই বিপ্লবের পর এক ধরনের নীরব প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—পুলিশ যেন কেবল দর্শক হয়ে থাকে, কখনো হাত তুলবে না।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শত শত ঘটেছে আমাদের দরজার সামনেই। নির্বাচনের আগের শেষ শুক্রবার সকালে এক হাজারেরও বেশি সরকারি কর্মকর্তা আকস্মিক ও সহিংস বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে হয়েছিল। সন্ধ্যায় আবার ইনকিলাব মঞ্চের পালা। পুলিশ যখন শেষ পর্যন্ত লাঠিচার্জ করে তাদের পেছনে ঠেলে দেয়, তখনই আমাদের ‘নাগরিক সমাজের ভাইয়েরা’ ক্ষোভে ফেটে পড়েন—‘এই কি সেই পুলিশ বাহিনী, যা আমরা চেয়েছিলাম?’
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অসংখ্য দাবিদাওয়ার এই নিরবচ্ছিন্ন চাপ অসাধারণ ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেছেন উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, মাসের পর মাস ঘুম যেন তার জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছিল, বাসভবনের চারপাশে অবিরাম কোলাহলের কারণে।দুঃখজনকভাবে এই কোলাহলের প্রভাব পড়েছিল তার অসুস্থ স্ত্রীর ওপরও। আমরা নিচতলায় কাজ করতাম কঠোর নির্দেশনা মেনে সম্মান দেখাতে যেন একদম নীরবতা বজায় রাখা হয়। কিন্তু বাইরে থেকে ভেসে আসা ক্ষোভের বিস্ফোরণ কিছু সত্যিকারের, কিছু সাজানো যমুনার দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়া ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের ছিল না।
আমরা কি খুব নিষ্ঠুর মানুষ—এমন প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, অন্যায়, অত্যাচার আর অবিচারের নামে যে বিপুল যন্ত্রণা ও চাপ আমরা মাসের পর মাস দুইজন বয়স্ক মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছি, তার অনেক কিছুই হয়তো ইতিহাসের বইয়ে লেখা থাকবে না। কিন্তু আমরা তাদের সেই কষ্ট চোখের সামনে দেখেছি। সবচেয়ে ‘মজার’ বিষয় হলো- ক্ষমতা হস্তান্তরের পর হঠাৎ করেই সবকিছু কত শান্ত হয়ে গেছে। বিক্ষোভগুলো থেমে গেছে। ‘চল যমুনা ঘেরাও করি’ স্লোগানও স্তব্ধ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, সেই বিশৃঙ্খলা যেমন হঠাৎ এসেছিল, তেমনি হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেছে। যেন অনেকটাই পরিকল্পিত এক ক্ষণস্থায়ী ঘটনা ছিল।