০৯ মার্চ ২০২৬, ১৯:৪৫

`দাড়ি-টুপিসহ ঢাবি ছাত্রকে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য ছিল, যদি একবার বলা যায় জামাত শিবির’

দিলশানা পারুল  © ফাইল ফটো

‘দাড়ি-টুপিসহ ঢাবি ছাত্রকে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য ছিল, যদি একবার বলা যায় জামাত শিবির’ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-১৯ আসনের এনসিপি মনোনীত সাবেক সংসদ সদস্য প্রার্থী দিলশানা পারুল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা লেখেন।

দিলশানা পারুল লেখেন, ‘আমি জীবনে কখনো "বিএনপিজামাত" করি নাই এবং ভবিষ্যতেও কখনো করার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু গত ২০১৪ সালের পর থেকে অনলাইন এবং অফলাইনে আমাদের হাসিনা রেজিম বিরোধী যা কিছু এক্টিভিজম, তার পুরোটাই বিএনপি-জামাতের পকেটে ঢুকেছে। এবং এই বিষয় নিয়ে আমাদের কারোরই কখনো কোনো অবজেকশন ছিল না, এটা নিয়ে আমাদের কখনো মাথা ব্যথা ও ছিল না। হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের প্লাটফর্মে আমরা তখন সবাই এক কাতারের যোদ্ধা। কেউ তখন প্রশ্ন করেনি কাউকে, কে গুপ্ত, কে সুপ্ত, কে নামে বেনামে ব্যানারে আন্দোলন করছে। আমাদের লক্ষ্য ছিল একটা, শত্রু ছিল কমন, কাজেই মিত্র চিনতে সমস্যা হয়নি।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমি জামাতে ইসলামির রাজনীতি করি না, কখনো করবোও না, জামাতে ইসলামকে রাজনৈতিক দায় মুক্তি দেওয়ার দায়ভারও ওই জন্য আমার নাই। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিকে যদি সামনে আগাতে হয়, তাহলে "জামাতে ইসলামির" রাজনৈতিক প্রশ্নটা পরিষ্কার করে তবেই সামনে আগাতে হবে।’

"জামাতে ইসলাম" এই শব্দটা নিয়ে গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে যে পরিমাণে রাজনীতি হয়েছে, জামাতে ইসলামি নিজে যদি তার ব্যানারটা নিয়ে তার অর্ধেক রাজনীতিও খোলামেলা ভাবে করতে পারতো, তাহলে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটা অন্য জায়গায় থাকতো।’ 

‘আওয়ামী লীগ বলেন, বিএনপি বলেন, এমনকি বামপন্থিরা বলেন, প্রত্যেকে "জামাতে ইসলামি" শব্দটাকে তাদের প্রয়োজনমতো রাজনীতির অঙ্গনে ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সফলভাবে ব্যবহার করতে পেরেছে আওয়ামী লীগ, যেহেতু তারা "মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের" শক্তি, আর জামাত ইসলামি ছিল "মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের" শক্তি।’ 

সাবেক এই সংসদ সদস্য প্রার্থী লেখেন, ‘এই রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যি সত্যি মনে করত যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামাতে ইসলামির বাংলাদেশের মাটিতে শাস্তি হওয়া উচিত কিংবা রাজনীতি করার অধিকার নাই, তাহলে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দফায় দফায় জামাতে ইসলামির সাথে রাজনৈতিক জোটভুক্ত হত না। এমনকি এই বামপন্থীরাও আওয়ামী লীগকে কিন্তু জামাত ইসলামের সাথে জোট করার কারণে কোন ধরনের কোন জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসে নাই বা নিয়ে আসার প্রয়োজন তারা মনে করে নাই। বরং সর্বতোভাবে সবসময়ই আওয়ামী লীগকে তারা চোখ বন্ধ সমর্থন দিয়ে গেছে।’

‘জামাতে ইসলামিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাখা হয়েছে সবচেয়ে বড় ট্যাবু এবং স্টিগমা হিসেবে। এই স্টিগমা যার গায়ে লাগবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই ব্যক্তি বা দলকে অচ্ছুত হিসেবে হাজির করা হবে। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ গত ১৭ বছরে বিএনপি। খেয়াল করে দেখবেন, গত ১৭ বছরে বিএনপিকে কখনোই শুধু বিএনপি বলা হয় না, বলা হতো বিএনপিজামাত।’ 

‘আপনার সামনে যদি একটা কমন ঘৃণার বস্তু থাকে, তখন মানুষের মনস্তত্ত্বকে ওই ঘৃণার বিরুদ্ধে চালিত করা সহজ হয়। শাসকের বা রাজনৈতিক দলের যেকোনো অন্যায় অপরাধকে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া সহজ হয় যদি এই অপরাধকে ওই "ঘৃণিত ব্যক্তি" বা "গোষ্ঠীর" বিরুদ্ধে করা হয়। এ কারণেই আমরা দেখেছি, ১৭ বছর ধরে আয়না ঘর চলতে পেরেছে, গুম, খুন, ক্রসফায়ার চলতে পেরেছে, প্রকাশ্যে দাড়ি টুপিওয়ালা লোককে অবলীলায় তুলে নিয়ে যাওয়া চলতে পেরেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাড়ি টুপি থাকলেই যে কোনো ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য হয়েছে। শুধু যদি একবার বলা গেছে, এ "জামাত শিবির" করে।’

এনসিপির এই নেত্রী লেখেন, ‘বাংলাদেশে, বিশেষ করে গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছে যে 'জামাত শিবির ঘৃণা’ বিরোধী রাজনীতিতে একটি সফল রাজনৈতিক মডেল। যে মডেলের উপর ভর করে ১৭ বছর একটা স্বৈরাচারী শাসন কায়েম রাখা যায়, হাজার কোটি টাকা অবলীলায় লুট করা যায়, এমনকি স্বাধীন দেশের ২০০০ মানুষকে হত্যা করার পরও সিম্প্যাথি পাওয়া যায়।’

‘আওয়ামী লীগের নেতারা চলে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে জামাত শিবির ঘৃণার সফল রাজনৈতিক মডেল। ৫ ই আগস্ট-এর পর এই মডেলটাকেই বিএনপি আপন করে নিয়েছে, কারণ এটি যেহেতু একটি পরীক্ষিত সফল রাজনৈতিক মডেল, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এবং নির্বিঘ্নে দেশ চালানোর জন্য।’

‘বিপদ হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যি কথা বলা যায় না। সত্যি কথা বলতে হয় সুগার কোটিং করে। নিখাদ সত্যি কথা বললে আপনি আনসফসটিকেটেড এবং পলিটিক্যাল না। সত্যকে আপনি যত সুগার কোটিং করে মিথ্যা দিয়ে মিলিয়ে-মিশিয়ে বলবেন, তত স্টাবলিশমেন্ট আপনাকে বাহবা দেবে, গ্রহণযোগ্য হিসেবে হাজির করবে। কিন্তু জুলাইয়ের পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা শর্ত তৈরি হয়েছে। সেই শর্তটা হচ্ছে সত্যকে সত্যের মতো করেই বলতে হবে। সেটা যতই তেতো, যতই আনকম্ফোর্টেবল হোক।’