বিএনপি নেতাকর্মীদের চাঁদা না দেওয়ায় কারখানা ভাঙচুর করে পণ্য লুটের প্রতিবাদ জামায়াতের
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বিএনপি নেতাকর্মীদের চাঁদা না দেওয়ায় একটি কারখানায় সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও ট্রাক এনে পণ্য লুটের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আজ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এই বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে অবস্থিত বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় শারীরিক প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তা মনোয়ার হোসেনের প্রতিষ্ঠিত রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একদল সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর, শ্রমিকদের মারধর এবং কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। চাঁদা দাবির প্রেক্ষিতে এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়, বরং দেশের শিল্পখাত, বিনিয়োগ পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত। আমি এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আরও বলেন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করার অপচেষ্টা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশেষ করে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো অত্যন্ত ঘৃণ্য ও অমানবিক কাজ। এ ধরনের ঘটনা দেশে আইনের শাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন তোলে।
পত্রিকায় এই ঘটনার অভিযোগে রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুল রহমান হুমায়ুনের নাম এসেছে। আমি অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত দাবি করছি এবং জড়িতদের দলীয় পরিচয় যাই হোক তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, দেশে শিল্পায়ন ও রপ্তানি বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে যদি উদ্যোক্তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে চাঁদা ‘না দেওয়ায়’ একটি কারখানা ভাঙচুর ও ট্রাক এনে পণ্য লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নোয়াগাঁও ও এর আশপাশের এলাকায় বেশ কিছু মাঝারি ও ক্ষুদ্র উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তার একটি বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ। জিআই তার উৎপাদনকারী এই কারখানাটির মালিক নোয়াগাঁও’র শারীরিক প্রতিবন্ধী মনোয়ার হোসেন ওরফে অপু (৪৩)। তাঁর কারখানার জিআই তার সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ ১২টি দেশে রপ্তানি হয়। ২০২০ সালে সাড়ে ১০ শতাংশ জমি কিনে এ কারখানা গড়ে তোলেন মনোয়ার হোসেন। কারখানাটিতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অর্থায়ন রয়েছে। সম্প্রতি কারখানাটিতে হামলা-ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়।
এ নিয়ে কারখানাটির ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কারখানাটিতে কর্মীদের মারধর, ভাঙচুর এবং ট্রাক এনে মালামাল লুট করা হয়েছে। হামলার পর দুই দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। পরে শিল্প পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়।
এ ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একাধিক ব্যবসায়ী বলছেন, সব সময় তাদের কম-বেশি চাঁদা দিতে হয়; কিন্তু এভাবে হামলা ও মালামাল লুট তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, বিএনপির রূপগঞ্জ উপজেলার সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুনের পরিচয় ব্যবহার করে স্থানীয় বিএনপির একদল লোক বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মনোয়ার হোসেনের কাছে এককালীন ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। পাশাপাশি মাসে ১ লাখ টাকা করে দেওয়ার দাবিও আছে তাঁদের। চাঁদা না দেওয়ায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানার কয়েকজন শ্রমিক ও স্থানীয়রা গণমাধ্যমকে জানান, হামলাকারীরা কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ খানকে মারধর করে। তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে কর্মচারী জুলহাস উদ্দিনকেও পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে তাঁদের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলাকারীরা কারখানার সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরাও ভেঙে ফেলে, আসবাব ভাঙচুর করে এবং ট্রাক এনে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল লুট করে নিয়ে যায়।
বিষয়টি নিয়ে কারখানার মালিক মনোয়ার গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন, ঘটনাটি নিয়ে মামলা করতে গেলে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমানের নাম বাদ না দিলে মামলা নিতে অপারগতা জানান। ঘটনার পরদিন সেভাবেই মাহফুজুর রহমানের নাম বাদ দিয়ে মামলা করেন তিনি। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়।
এমনকি মামলা করার সময় হুকুমের আসামি হিসেবে এজাহারে তিনি মাহফুজুর রহমানের নাম উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু থানার ওসি মাহফুজুরের নাম বাদ না দিলে মামলা নেবেন না বলে জানান। তিনি বাধ্য হয়ে মাহফুজুরের নাম বাদ দিয়ে মামলা করেছেন বলেও জানান কারখানার মালিক মনোয়ার।
মামলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করা হয়। অন্য আসামিদের মধ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই কাজল আকন, ভাইয়ের ছেলে নিশাত আকন, মাহফুজুর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপির কর্মী মো. সজল হোসেন, সাদিকুল, মো. ফাহিম, আজিজ মৌলভি ও বোরহানউদ্দিনের নাম রয়েছে। আসামিদের বেশির ভাগই জিন্দা গ্রামের বাসিন্দা। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, হামলাকারীরা নগদ অর্থসহ ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পণ্য নিয়ে গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে বাদী মনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকন ও নিশাত আকন সভাপতি মাহফুজুর রহমানের নাম ব্যবহার করে দফায় দফায় চাঁদা দাবি করেছেন। অন্তত চার দফায় বিষয়টি মাহফুজুর রহমানকে জানিয়েছেন তিনি। কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো চাঁদা দাবি করা লোকদের সঙ্গে মীমাংসার প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি।
তবে রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন এ অভিযোগ অস্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি কারও নাম বাদ দিতে বলেননি। তিনি বলেছেন মামলায় সত্য ঘটনা দিতে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেন, কারখানা মালিকের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তাঁকে কোনো দিন দেখিনি। ফলে চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি আমাকে চার দফায় জানানোর দাবি পুরোপুরি মিথ্যা। জানালে আমি ব্যবস্থা নিতাম। ঘটনার দিন থানা থেকে ফোন পেয়ে আমি বরং খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনজনকে পাঠাই। পরে শুনি এ তিনজনের নামে মামলা হয়েছে।
অভিযোগ নিয়ে রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হননি। তাঁরা চেষ্টা করছেন এবং অন্য সংস্থায় মামলাটি দেওয়ার কথা চিন্তা করছেন।
ঘটনাটি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মামুন মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, যে ধরনের ঘটনার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে, তা যদি সত্য হয়, তবে সেটা ফৌজদারি অপরাধ। এই ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তারা যত বড় নেতাই হোক, দল তখন তাদের অপরাধী হিসেবেই দেখবে। দলীয় পরিচয়ের কারণে কেউ কোনো প্রকার ছাড় পাবে না।