এনসিপির এমপি আখতারের সফর ঠেকাতে হরতালের ডাক বিএনপির, পরে প্রত্যাহার
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ পৌর এলাকায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের সফর ঠেকাতে রবিবার হরতালের ডাক দিয়ে পরে প্রত্যাহার করে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা করেছে স্থানীয় বিএনপি। রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভোর রাতে নিজের ফেসবুক একাউন্টে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে এই অভিযোগ করেন এমপি আখতার হোসেন।
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, সরকার গঠন করেছে বিএনপি আর নতুন সরকারের আমলে প্রথম হরতাল হচ্ছে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। রংপুর-৪ এর হারাগাছে আজ আমার বিরুদ্ধে হরতাল ডেকেছে এমদাদুল ভরসার পৌর বিএনপি। এনারা আসলে বিএনপি করেন না, ভরসা করেন। কিন্তু বিএনপির সরকার গঠনের আভাস পাওয়ার পর থেকে বাড়িঘর ভাঙচুর, লোক পেটানো, রক্তাক্ত করা, লুটপাট, ভয়ভীতি দেখানো, আন্দোলনের নামে সহিংসতা সব করছে বিএনপির নামে।
হারাগাছ প্রসঙ্গে আখতার উল্লেখ করেন, ১২ তারিখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুরো দিন আমি হারাগাছ পৌরসভায় অবস্থান করি। খুবই খারাপ লাগছিলো কারন কোনও কেন্দ্রের সামনে এনসিপির শাপলা কলি মার্কার ব্যাচ ধারণ করে কাউকে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। ২০ টি কেন্দ্রের প্রত্যেক কেন্দ্রের সামনে শত শত ধানের শীষের লোক আর অল্প কিছু মানুষ শাপলা কলির। ব্যাচ না থাকায় তাদের দূর থেকে আলাদা করে চেনাও যায় না।
তিনি জানান, চর চাতুরী আদর্শ কেন্দ্রে গিয়ে শুনি ভরসার লোকেরা একটু আগেই আমার দুইজন কর্মীকে থাপ্পড় দিয়েছে। ওরা আর কেন্দ্রের কাছেও আসতে পারছে না। হারাগাছ মডেল কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখি কেন্দ্রের বাইরে শাপলা কলির ভোটার স্লিপ বিতরণের টেবিল ভরসার লোকেরা ভেঙে দিয়েছে। মোল্লাটারী কেন্দ্রে ভরসার লোকেরা শাপলা কলির কর্মীদের শাসিয়েছে, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করেছে, লাঠি দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। প্রায় প্রত্যেক কেন্দ্রে একই অবস্থা। প্রশাসনকে বলে, মিডিয়ায় উল্লেখ করে কোথাও কোনও সুরাহা পাওয়া যায় নি।
আরও পড়ুন: আজ দুই ঘণ্টা মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হতে পারে অনেক গ্রাহকের
নির্বাচনের দিনের ঘটনা উল্লেখ করে আখতার বলেন, রংপুর-৪ আসনে সবসময় নির্বাচন নিয়ে একটা ভয় থাকে যে কাউনিয়া পীরগাছার বাকী সব কেন্দ্রে ফলাফল যা-ই হোক হারাগাছের প্রার্থী হারাগাছে যেমনে হোক ফলাফল ঘুরিয়ে দেবে। রংপুর-৪ এ ৫ লাখ ৯ হাজার ভোটারের মধ্যে একক এলাকা হিসেবে সবচে বেশি ভোট হারাগাছ পৌরসভায়। মোট ভোটার ৫৫,৪৫১ জন। এই ভোটগুলো নিয়েই এবারও ভরসার প্লান ছিলো। সেই প্লান কিছু তারা বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু ভরসার লোকদের হারাগাছের ভোটের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেখানোর জালিয়াতি বন্ধ করতে পারায় শাপলা কলি জিতে আসতে সমর্থ হয়৷ তাদের সেই কূটচালের ক্ষোভ এখনও মেটেনি।
তিনি বলেন, বিকাল বেলা আমরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করি। সারাদিন নির্বাচন নিয়ে ভরসার লোকেরা যা অনিয়ম, অত্যাচার করার করেছে কিন্তু হিসেবের সময় যেনো অতিরিক্ত ভোট দেখাতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই হিসেবে আমি প্রত্যেক কেন্দ্রে কতো ভোট কাস্টিং হলো সেই হিসেব নিতে কেন্দ্রে কেন্দ্রে যেতে শুরু করি। প্রায় কেন্দ্রগুলোতে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসাররা আমাকে অসহযোগিতা করেছেন। আমি ভোট গণনা বিষয়ক প্রার্থীর অধিকার বিষয়ক আইনের উল্লেখ করে করে কাস্টিং ভোটের হিসেব লিখে নেই। কোন মার্কায় কতো ভোট তখনও তার হিসেব বের হয়নি। শুধুমাত্র কোন বুথে, কোন কেন্দ্র কতটি ভোট পরেছে সেই হিসেব নিতে পারছিলাম। সময় উল্লেখ করে প্রিজাইডিং অফিসারকে দেখিয়ে সেসব ছোট নোট খাতায় লিখে রাখছিলাম।
তিনি আরও বলেন, হারাগাছ মডেল কলেজ কেন্দ্রে কাস্টিং ভোটের হিসেব নিয়ে বের হতে গিয়ে দেখি শত শত ভরসার ভাড়া করা লোকেরা কেন্দ্রের গেট আটকিয়ে দিয়েছে। তারা আমাকে মারার হুমকি দিচ্ছে। ইট-পাটকেল ছুড়ছে। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছে। আমাকে তারা জ্যান্ত বের হতে দেবে না। এমতাবস্থায় আর্মি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আমি কেন্দ্র থেকে জীবন নিয়ে বের হতে সক্ষম হই।
আখতার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে ধানের শীষের প্রার্থী এমদাদুল ভরসা হাজির হন। তিনি প্রথমে আমাকে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমার বলা আইনি যুক্তির কাছে হার মেনে নেন। এমনকি আমার সাথে পরবর্তী কেন্দ্রগুলোতে কাস্টিং ভোটের হিসেব নিতে রওয়ানা হন। আমরা হাত ধরাধরি করে দরদী স্কুল কেন্দ্রে প্রবেশ করি। সেখানে কেবল ব্যালট বক্সগুলো খোলা হয়েছে। আমি এবং ভরসা সাহেবের পিএস কাস্টিং ভোটের হিসেব লিখে নেই। দূঃখের বিষয় হলো হিসেব নেয়ার সময় সেখানে শাপলা কলির কোনও এজেন্টে আমি পাইনি।
তিনি লেখেন, দরদী স্কুলের বাইরে বের হতেই দেখি ভরসা ভাইয়ের গাড়ির গ্লাস ভাঙা। গ্লাসের ভাঙা জায়গায় ছোট গ্লাসের টুকরোগুলো বাইরে বের হতে চাইছে। একটু তাকালেই বোঝা যায় ভেতর থেকে ভাঙা হয়েছে। মজার বিষয় হলো সেখানে ভরসা ভাইয়ের গাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি, পেছনে আমার গাড়ির পরেই কয়েকটা আর্মির গাড়ি। আর জনসাধারণের সেখানে প্রবেশাধিকার নাই। তবুও ভরসা ভাই এনসিপিকে গাড়ির গ্লাস ভাঙার দায়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করলেন। মিথ্যা অভিযোগ দিলেন। তাঁর পিএস বললেন ভিডিও আছে তার কাছে। আমিও মেজিস্ট্রেটকে বললাম ভিডিও দেখে এনসিপির লোক হলেও গ্রেফতার করতে। অথচ ভিডিও এলো না, না কেউ গ্রেফতার হল আর না ভরসার লোকেরা গাড়ি ভাঙা নিয়ে কথা বলছে। নিজের ফাঁদে নিজে ফেঁসে যাবার ভয় ভরসার লোকেদের ভালোই ধরেছে বোঝা যাচ্ছে।
নির্বাচনের দিনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর ১২ তারিখ সারাদিন গেলো, সারারাত গেলো, শাপলা কলি জিতে এলো। ভরসা সাহেব কোথাও কোনও মিডিয়ায় ভোট নিয়ে কোনও অনিয়ম, কোনও অসুষ্ঠতার অভিযোগ জানালেন না। হারাগাছে ভোটের অনিয়মের যে প্লান তার ছিলো সেই অভিযোগ নিজে আগেভাগে ভরসা করে কেমনে? এজন্য সারাদিন মনে মনে যে অনিয়মের প্লান তার থাকুক, মুখে মুখে সুষ্ঠু ভোটের কথাই বলে গেছেন ভরসা সাহেব।
নিজে হেরেছে, ভেবেছে সরকারও বোধহয় ১১ দলের হবে এজন্য কিছু সময় তাণ্ডব শুরু করেনি। এরপর যখনি বিএনপি সরকার গঠন করবে এমন আভাস আসতে শুরু করলো ১৩ তারিখ থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠলো ভরসা বাহিনী। ভরসার লোকেরা হারাগাছে এনসিপির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর করতে শুরু করলো। অনেককে মেরে রক্তাক্ত করলো, লুটপাট চালালো।
আরও পড়ুন: কলেজ শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৬
‘একদিকে ভরসা নিজে শাড়ি-লুঙ্গি দেয় আর অন্যদিকে তার কর্মীদের দিয়ে লুটপাট চালায়। নির্বাচনের দশ দিন পার হলো হারাগাছে এনসিপির অনেক কর্মী এবং তাদের পরিবার এখনও বাড়িতে যেতে পারে নাই। শাড়ি-লুঙ্গি দেয়া ভরসা কি তার কর্মীদের দ্বারা বাড়ি ভাঙা, বিয়ের সময় গিফট পাওয়া স্বর্ণ লুটপাটের শিকার সেই অসহায় মায়ের চিৎকার শুনতে পায়? নাকি সেইসব অসহায় গৃহবধূর, শিশুর, মায়ের আর্তচিৎকারে ভরসার আনন্দ? হারাগাছে ৫৫ হাজার ভোটের মধ্যে ২৭ হাজার পেয়েছে ভরসা, তার থেকে ২২ হাজার ভোট কমে ৫ হাজার ভোট পেয়েছি আমি৷ কিন্তু হারাগাছে প্রতিটা ভোট আমার কাছে হাজার ভোটের সমান৷ আমি আমার হারাগাছের ভোটার এবং সবার মর্যাদা রক্ষা করার লড়াইয়ে আছি।’
এনসিপি নেতা লেখেন, ওদের প্লান ছিলো কাস্টিং ভোটের চেয়ে আর ১৫-২০ হাজার ভোট ধানের শীষে বেশি দেখানোর। কয়েকজন সাহসী মানুষকে সাথে নিয়ে আমরা সেই জালিয়াতি ঠেকিয়েছি। এট সবাইকে টার্গেটে নিয়ে হত্যার হুমকি দিচ্ছে ভরসা বাহিনী। তাদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলে রেখেছে। প্রশাসন এখনও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি৷
তিনি বলেন, আজ আমি হারাগাছে আসবো শুনে ভরসা বাহিনী সরকারে থেকে বিরোধী দলের একজন নেতার বিরুদ্ধে হরতাল ডেকেছে। মাইকিং করে দোকানপাট বন্ধ রাখার হুমকি দিচ্ছে। শুনলাম একটু আগে হরতাল প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু বিক্ষোভ করবে তারা।
তিনি আরও বলেন, আমি হারাগাছে আমার প্রথম সফর করতে চেয়েছিলাম নির্বাচনের পরদিন। ভরসা বাহিনীর সন্ত্রাসের কারনে পারিনি। আজ আমি হারাগাছে আসবো ভরসা বাহিনীর দ্বারা ভেঙেচুরে রাখা বাড়িঘরগুলো দেখতে। বাড়ি ভাঙা, লুকিয়ে থাকা মানুষদের পাশে দ্বারাতে। তাদের জন্য বিচারের দাবি নিয়ে। আর গত দেড় বছরে আমি হারাগাছ পৌরসভার জন্য তিন দফায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ এনেছি৷ সেসব বরাদ্দের কিছু কাজ এখন শুরু হবে। সেই বরাদ্দগুলো কোন কোন খাতে খরচ হলে বেশি মানুষের উপকার হবে তা জানতে আজ হারাগাছে আসবো। কয়েকটি আধুনিক টয়লেট নির্মাণ করা যায় কিনা বা অন্য কিছু।
স্ট্যাটাসের শেষে তিনি বলেন, আমার হারাগাছে আসা নিয়ে যদি কিছু ঘটে তার দায় ভরসা এবং বিএনপির হাইকমাণ্ডকে নিতে হবে। আমরা হারাগাছের নিপীড়িত শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করে যাব ইনশাআল্লাহ।
এর আগে, শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টার দিকে হারাগাছ পৌর শহরের হকবাজার এলাকায় ‘রংপুর-৪-এর সাধারণ ভোটার’ ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিএনপি নেতাকর্মীরা। মিছিল শেষে প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে কর্মসূচির ঘোষণা দেন পৌর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সভাপতি মোনায়েম হোসেন ফারুক। এ সময় বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমীন দাজু ও সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ সমাপ্তি।
বক্তারা অভিযোগ করেন, জনগণের রায় ছিনতাই করে আখতার হোসেন সংসদ সদস্য হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে তার হারাগাছ সফর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা বলেও দাবি করেন তারা। সফরের প্রতিবাদে জনসাধারণকে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
হারাগাছ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অশোক চৌহান জানান, সফর ঘিরে যাতে কেউ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সেজন্য পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে।