১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:১৩

যেসব সুবিধা পাবেন প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-এমপিরা

জাতীয় সংসদ  © সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ও শরিকদল। সম্ভাব্য মন্ত্রীসহ ভোটগ্রহণ স্থগিত একটিসহ মোট তিনটি আসন ছাড়া বাকি আসনের সংসদ সদস্যরা আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথগ্রহণ করতে যাচ্ছেন। শপথের পর এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীসহ সংসদীয় নানা পদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দ্বার উন্মোচিত হবে নির্বাচিত এসব ব্যক্তির জন্য।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার এবং বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক পদের বেতন ভাতা নির্ধারিত হয় আইনের মাধ্যমে। বিভিন্ন সময় আইন সংশোধন করে বেতন ভাতা বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী এবং স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারের বেতন-ভাতা বাড়াতে সংসদে আইন পাস হয়। অবশ্য সাংবিধানিক এ পদধারীদের আর্থিক সুবিধাদিকে বেতন ভাতা না বলে সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধা (রেমুনারেশেন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) উল্লেখ করা হয়।

‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট’-এ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদাক্রম অনুযায়ী চিফ হুইপ এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাও পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করেন। আর হুইপরা ভোগ করেন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা।

প্রধানমন্ত্রীর বেতন ভাতা
প্রধানমন্ত্রীর বেতন মাসে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, বাড়ি ভাড়া ১ লাখ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর দৈনিক ভাতা ৩ হাজার টাকা, বিমান ভ্রমণের জন্য বিমা কভারেজ ২৫ লাখ টাকা এবং স্বেচ্ছাধীন তহবিল দেড় কোটি টাকা পান। অবশ্য সরকারি বাড়িতে বসবাস করলে তিনি বাড়ি ভাড়া পাবেন না।

মন্ত্রীদের বেতন ও বাড়িভাড়া
একজন মন্ত্রীর মাসিক বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। প্রতিমন্ত্রীর বেতন ৯২ হাজার ও উপমন্ত্রীর ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। দায়িত্ব পাওয়ার পর একজন মন্ত্রী সরকারি ব্যয়ে একটি সুসজ্জিত বাসভবন পান বিনা ভাড়ায়। প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী একই সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে মন্ত্রী যদি সরকারি বাড়িতে না থেকে নিজ বাড়ি বা ভাড়া বাড়িতে থাকেন, তাহলে সরকার থেকে তিনি মাসিক ৮০ হাজার টাকা করে ভাড়া পাবেন। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পাবেন ৭০ হাজার টাকা করে। এ ছাড়া নিজ বাড়ি বা ভাড়া বাড়িতে বসবাস করলে সেটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে তিন মাসের বাড়ি ভাড়ার সমপরিমাণ টাকা পাবেন তারা।

এলাকার উন্নয়নে বরাদ্দ টাকা নিরীক্ষামুক্ত
নিজ এলাকার মসজিদ, মন্দির উন্নয়নসহ এলাকার মানুষের দাতব্য কাজে একজন মন্ত্রীকে বছরে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ খাতে প্রতিমন্ত্রী পাবেন সাড়ে ৭ লাখ ও উপমন্ত্রী পাবেন ৫ লাখ টাকা করে। এ টাকার মধ্যে মন্ত্রী চাইলে একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা দিতে পারেন। প্রতিমন্ত্রী দিতে পারেন ৩৫ হাজার আর উপমন্ত্রী ২৫ হাজার টাকা। এলাকার উন্নয়নে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের এই টাকার কোনও নিরীক্ষা হয় না। ফলে এ টাকা খরচে অনেকটা উদার থাকেন তারা।

আপ্যায়ন ভাতা
মন্ত্রী হওয়ার পর তার দপ্তরে দেশি-বিদেশি অনেকে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসেন। নির্বাচনী এলাকার মানুষও দেখা করতে আসেন। তাদের আপ্যায়নের জন্য একজন মন্ত্রী মাসে ১০ হাজার টাকা করে পান। এ খাতে প্রতিমন্ত্রী সাড়ে ৭ হাজার টাকা আর উপমন্ত্রী ৫ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী বছরে বিমা সুবিধা পাবেন ১০ লাখ টাকা।

চিকিৎসা খরচ
মন্ত্রীসভার সদস্যরা অসুস্থ হলে তার পুরো চিকিৎসা খরচ সরকার বহন করে। এ ক্ষেত্রে বলা আছে, চিকিৎসা খরচ সীমাহীন। সরকার তার পুরো চিকিৎসার খরচ দেবে। তবে খরচের ভাউচার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে হবে।

একটি করে গাড়ি সুবিধা
দায়িত্ব পাওয়ার পর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী সরকারি খরচে একটি করে গাড়ি সুবিধা পাবেন। এই গাড়ি পরিবহন পুল সরবরাহ করবে। এ ছাড়া সরকারি প্রয়োজনে ভ্রমণের সময় তারা মন্ত্রণালয়ের অধীনে যেকোনও সংস্থা বা দপ্তর থেকে একটি জিপ গাড়ি পাবেন। জ্বালানি বাবদ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী দৈনিক ১৮ লিটার জ্বালানি তেলের সমপরিমাণ অর্থ পাবেন। একজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দেশের ভেতরে কোথাও ভ্রমণে গেলে দৈনিক ভাতা পাবেন ২ হাজার টাকা করে। উপমন্ত্রী পাবেন দেড় হাজার টাকা করে।

বাড়ি সাজসজ্জায় প্রতিবছর ৫ লাখ টাকা
সরকারি বাড়ি সাজসজ্জা করতে একজন মন্ত্রী প্রতিবছর পাবেন পাঁচ লাখ টাকা। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা পাবেন চার লাখ টাকা করে। এ ছাড়া মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের বাসভবনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিফোন ব্যয় যা আসবে, সরকার পুরোটাই বহন করবে।

মন্ত্রী পাবেন ১০ সহায়ক
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উপসচিব পদমর্যাদার একজন একান্ত সচিব (পিএস) পাবেন। এ ছাড়া একজন সহকারী একান্ত সচিব এবং সরকারি কর্মকর্তার বাইরে নিজের পছন্দের একজন সহকারী, একান্ত সচিব পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, একজন জমাদার, একজন আরদালি, দুই জন অফিস সহায়ক ও একজন পাচক বা বাবুর্চি পেয়ে থাকেন। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী একজন একান্ত সচিব, একজন ব্যক্তিগত সহকারী, একজন জমাদার, একজন আরদালি ও একজন অফিস সহায়ক পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা একটি করে মুঠোফোন পাবেন।

মন্ত্রী পদমর্যাদায় চিফ হুইপ ও বিরোধী দলীয় নেতা
ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী, চিফ হুইপ ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদটি একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদার। এতে বিরোধী দলীয় নেতা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। তিনি একান্ত সচিব (পিএস), একজন সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস), দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, একজন বাহক, দুজন অফিস সহায়ক ও একজন পাচক পান। এ ছাড়া আটজন পুলিশ সদস্য, দুজন গানম্যান সুবিধা দেওয়া হয় তাকে। গাড়ির সুবিধাও পেয়ে থাকেন বিরোধীদলীয় নেতা। মন্ত্রীদের মত বিরোধীদলীয় নেতা সরকারি বাসা পেয়ে থাকেন। সেই বাসার যাবতীয় খরচ সরকার বহন করে। এ ছাড়া হুইপ একজন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার সুবিধা পান।

সংসদ সদস্য যা পান
একজন সংসদ সদস্যের মাসিক বেতন ৫৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া সংসদ সদস্য হওয়ার পর তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা পেয়ে থাকেন। একজন সংসদ সদস্য তার নির্বাচনী এলাকায় যাওয়া-আসার ভাতা হিসেবে প্রতি মাসে পাবেন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সম্মানী ভাতা বা আপ্যায়ন ভাতা প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা। মাসিক পরিবহন ভাতা পাবেন ৭০ হাজার টাকা, নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচের জন্য প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতি মাসে লন্ড্রি ভাতা দেড় হাজার টাকা, মাসিক ক্রোকারিজ, টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ভাতা ৬ হাজার টাকা, মসজিদ-মন্দির উন্নয়নে বছরে ৫ লাখ টাকা, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, বাসায় টেলিফোন ভাতা বাবদ প্রতিমাসে ৭ হাজার ৮০০ টাকা দেওয়া হয়। তার সব ভাতা করমুক্ত। একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা যে চিকিৎসা খরচ পান, একজন সংসদ সদস্য ও তার পরিবার সমান সুবিধা পাবেন।