০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:২৩

বিএনপিকে ভাবাচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থী, ঘুরে দাঁড়াতে চায় জামায়াত

পাবনা-৩ আসনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধীতা করছেন আটপ্রার্থী  © টিডিসি সম্পাদিত

পাবনা-৩ আসনে (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া- ফরিদপুর) জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। ভোটের মাত্র আর কয়েকদিন বাকি। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন আট প্রার্থী। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই বাড়ছে ভোটের প্রচারণা, নিজেদের জানান দিতে মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন তারা। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কী ভাবাচ্ছে বিএনপি মনোনীতি ধানের শীষের প্রার্থীকে? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ভোটারদেরকে। তবে অতীতের সকল কিছু ভুলে ঘুরে দাঁড়াতে চায় জামায়াত ইসলামী।

এই আসনে আটজন প্রার্থী হলেও মূলত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন, বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) ঘোড়া মার্কা প্রতীকের প্রার্থী সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জামায়াত প্রার্থী আলী আছগারের মধ্যে। এমন আলাপই চাউড় হচ্ছে ভোটারদের মুখে মুখে। এবারের নির্বাচনে দলীয় সমর্থন ছাড়াও ভৌগোলিকতা ও আঞ্চলিকতা জয় পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মক হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা মনে করেন।

জানা গেছে, ৭০ পাবনা-৩ চাটমোহর ভাঙ্গুড়া ফরিদপুর এই তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৮০৪ জন। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলার মোট ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ জন। নারী ভোটার ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৪৮ জন ও পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৯ জন। 

ভাঙ্গুড়া উপজেলার মোট ভোটার ১ লাখ ৮ হাজার ৯৬৮ জন, তার মধ্যে নারী ভোটার ৫৪ হাজার ৬৭৯ জন ও পুরুষ ভোটার ৫৪ হাজার ২৮৭ জন। অন্যান্য ২ জন। 

ফরিদপুর উপজেলার মোট ভোটার ১ লাখ ১৭ হাজার ৭১৯ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ৫৮ হাজার ৭৩৫ জন, পুরুষ ভোটার ৫৮ হাজার ৯৮০ ও অন্যান্য ভোটার সংখ্য ৪। তবে ভোটার হিসাবে ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর এই দুই উপজেলার চেয়ে চাটমোহর উপজেলায় ৩৩ হাজার ৪৩০ ভোটার বেশি। তাই নির্বাচনে চাটমোহর উপজেলার ভোটারদের ভৌগোলিকতা ও আঞ্চলিকতা পাল্টে দিতে পারে ভোটের মাঠের হিসাব-নিকাশ।

আরও পড়ুন : বিএনপি-জামায়াতের শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায়

অনুসন্ধানে জানা যায়, ৭০, পাবনা- ৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) আসনে তিনটি উপজেলার মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোটের উপজেলা চাটমোহর থেকে সর্বশেষ ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে  বিএনপি থেকে কে এম আনোয়ারুল ইসলাম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা আওয়ামী লীগের প্রার্থী মকবুল হোসেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিল ফরিদপুর উপজেলার বাসিন্দা সাবেক এমপি অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম। এরপর বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে মকবুল হোসেন বিজয়ী হয়েছিলেন। 

সর্বশেষ ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী চাটমোহরের বাসিন্দা আব্দুল হামিদ চাটমোহরে প্রায় ১৭ হাজার ভোটে জয়লাভ করলেও অন্য দুই উপজেলায় ৩৫ হাজার ভোটে হেরে পরাজিত হয়। ফলে চাটমোহর উপজেলার ভোটারদের মধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার প্রয়াস রয়েছে দীর্ঘদিনের। 

বিএনপির দলীয় প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন সুজানগরের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে চাটমোহরে স্থায়ী বাসভবন নির্মাণ করে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি ভোটের মাঠে তিন উপজেলায় দলের অনুগত নেতাকর্মীদের নিয়ে ভোটের মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন।বৈষম্যহীন সমাজ, সুষ্ঠু উন্নয়ন ও দুর্নীতি মুক্ত দেশ গঠনে তারেক রহমানের ৩১দফা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। 

চাটমোহরের বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করে বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় চাটমোহর উপজেলার বেশ কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করেছেন। 

আরও পড়ুন : চাঁদাবাজ.কম ওয়েবসাইট চালুর প্রতিশ্রুতি নাসীরুদ্দীনের ইশতেহার

এ ছাড়া জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আলী আছগার নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রচারণা চালিয়ে এখানে ভোট ব্যাংক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষত তিনি নারী ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন আদায় করতে পেরেছেন বলে রব উঠেছে। নির্বাচনী মাঠে তিনি চাঁদাবাজী বন্ধ, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের পাশাপাশি উন্নয়নে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। 

অন্যদিকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী চাটমোহরের কে এম আনোয়ারুল ইসলাম তার পূর্বের জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় ইস্যু কাজে লাগিয়ে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তাই এ নির্বাচনে চাটমোহরের ভোটারদেরকে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে ধারণা করছেন অনেকে। তবে চাটমোহরের অপর প্রার্থী সাবেক বিএনপি নেতা হাসানুল ইসলাম রাজা তিনি গণঅধিকার পরিষদে যোগ দিয়েই দল থেকে মনোনয়ন পেয়ে ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করছেন। জাতীয় পার্টির  লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী মীর মোহাম্মদ  নাদিমও চাটমোহরের বাসিন্দা। তবে জামায়াতে ইসলামী এবার নিজেদের এই আসনে শক্ত অবস্থান নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায়।

অপর দিকে এই আসনে সবচেয়ে ছোট উপজেলা ভাঙ্গুড়া। এখানে বিএনপি প্রার্থী দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সুসংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী আলী আছগার দলমত নির্বিশেষে ভোটের প্রার্থনা করে যাচ্ছেন। 

এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলামেরও নিজস্ব নেতাকর্মী রয়েছে। তাই তিনজন প্রার্থী এই উপজেলায় পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে অনেকেই গোপনে ঘোড়ার পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন কিন্ত প্রকাশ্যে আসছেন না এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। এই আসনের ফরিদপুর উপজেলা থেকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী না থাকায় ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপি, জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী।

এ উপজেলায় বিএনপি সাংগঠনিকভাবে পূর্ব থেকেই শক্তিশালী হলেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর নিজস্ব বলয় রয়েছে। তবে অনেক নেতাকর্মী দ্বিমত থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাহিরে যেতে পারছেন না অনেকে। 

পাশাপাশি জামায়াতের প্রার্থীর ভোট ব্যাংক রয়েছে এই ভাঙ্গুড়া উপজেলায়। কারণ এই উপজেলায় তার জন্মস্থান ও বেড়ে ওঠা।  ফলে ভোটারদের ধারণা এই উপজেলায় চরম প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে তিন প্রার্থীর মধ্যে। আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন, গণ অধিকার পরিষদের হাসানুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল খালেক, গণ ফোরামের আশা পারভিন, জাতীয় পার্টির মীর মোহাম্মদ নাদিম হোসেন ডাবলু, সুপ্রিম পার্টির মাহবুবুর রহমান।