আসিফ মাহমুদের ফান পোস্ট থেকে ছড়াল গুজব, ‘সত্য’ ধরে বিভ্রান্তও হলো অনেকে!
‘আপা আসবে তাই চলে যাচ্ছি, বিদায় বাংলাদেশ!’—জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ইউটিউব এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ ও ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। তার পোস্টটির ব্যঙ্গাত্মক প্রেক্ষাপট ও বিদেশ সফরের তথ্য যাচাই না করেই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এনসিপির এই নেতা সত্যিই বাংলাদেশ ছেড়েছেন।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ফান পোস্ট ইউটিউব ও গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে বাস্তব ঘটনার মতো সত্য হয়ে ভাইরাল হয়েছে। এতে সাধারণ পাঠকরা বিভ্রান্তও হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেছেন, প্রকৃত অর্থে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দেশ ছেড়েছেন। তবে আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ফেসবুকের এক পোস্টে সেই যাত্রা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন এনসিপির এই নেতা।
এর আগে গত ৩ নভেম্বর রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিমানের ভেতরে তোলা একটি ছবি পোস্ট করেন আসিফ মাহমুদ। ছবিতে তার সঙ্গে ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘আপা আসবে তাই চলে যাচ্ছি। বিদায় বাংলাদেশ!’ তবে তারা কোথায় যাচ্ছেন, সে বিষয়ে পোস্টে কোনো তথ্য দেননি তিনি।
আসিফ মাহমুদের সেই পোস্টটি
পোস্টটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। এ প্রতিবেদনটি লেখার সময় পোস্টটিতে আড়াই লাখ রিয়্যাকশন, মন্তব্য ও শেয়ার জমা পড়ে। এর পরবর্তী দুই দিন আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নতুন কোনো পোস্ট দেখা না গেলেও তার ভেরিফায়েড পেজে বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশিত হয়।
আগামী ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে আসিফ মাহমুদের ‘আপা আসবে’ মন্তব্যটিকে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ বা রসিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আসিফ মাহমুদের পোস্টের পরপরই তাকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। একটি দৈনিক পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ তাদের প্রতিবেদনে পোস্টটিকে ‘ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে। তবে কয়েকটি গণমাধ্যমের শিরোনামে ‘বিদায় বাংলাদেশ’ বক্তব্যটিই প্রাধান্য পায়।
ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিও
শীর্ষ একটি দৈনিক পত্রিকার অনলাইন ও স্যাটেলাইট টিভির অনলাইন সংস্করণে ‘আপা আসবে তাই চলে যাচ্ছি, বিদায় বাংলাদেশ: আসিফ মাহমুদ’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে। আরেকটি দৈনিক পত্রিকার অনলাইন অনলাইন সংস্করণেও ‘আপা আসবে তাই চলে যাচ্ছি’ বক্তব্যটি শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া শতাধিক ইউটিউবের চ্যানেলে ‘আপা আসবে তাই চলে যাচ্ছি, বিদায় বাংলাদেশ’ শিরোনাম ও থাম্বনেল রেখে ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।
আসিফ মাহমুদের এমন ফান পোস্ট ‘সত্য’ হয়ে ছড়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পাশাপাশি বিভ্রান্তও হয়েছেন অনেকেই। ইউটিউবে এসব ভিডিওর নিচে শওকত আলী মীর নামে একজন লেখেন, একটাও যেন পালাতে না পারে। সোহাগ আহমদ লিখেছেন, ইনশাআল্লাহ শেখ হাসিনা ফিরবে এবং আল্লার রহমতে আবার ও ক্ষমতায় যাবে বাংলাদেশের। মো. মামুন লিখেছেন, কথাটা যদিও রসকিতার সহিত বলেছে কিন্তু এটাই সত্যিই যে ওরা আর বাংলাদেশে আসবে না সময়মতো দেখতে পারবেন সবাই।
এসব শিরোনাম ও প্রতিবেদনের উপস্থাপনায় পাঠকের মনে আসিফ মাহমুদ সত্যিই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন—এমন ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ পোস্টের প্রেক্ষাপট এবং তার পরবর্তী কার্যক্রমের তথ্য যাচাই করলে সামনে আসে ভিন্ন চিত্র।
আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নতুন পোস্ট না থাকলেও তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিদেশ সফরের তথ্য পাওয়া যায়। পেজের সর্বশেষ পোস্টটি ছিল আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে। সেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজের (আইসিএপিপি) ১৩তম সাধারণ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেন তিনি।
পোস্টে আসিফ মাহমুদ লেখেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে আইসিএপিপির ১৩তম সাধারণ অধিবেশন। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অংশগ্রহণ করছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্মেলনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার, অর্থবহ সংলাপ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতে কাজ করছে দলটি।
প্রকাশিত ছবিগুলোতে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনকেও দেখা যায়। অর্থাৎ, বিমানের ভেতরে তোলা ছবিটি তাদের বিদেশ সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত। দক্ষিণ কোরিয়ায় সম্মেলনে অংশ নেওয়ার তথ্যও তার ভেরিফায়েড পেজে প্রকাশিত হয়েছে।
এসব তথ্য থেকে আসিফ মাহমুদ বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তার পোস্টের সঙ্গে বিদেশ সফরের যোগসূত্রই সামনে এসেছে।