নেপালের বিরোধীদলীয় নেতার দেশে ফেরা নিয়ে ভুল তথ্য গণমাধ্যমে
নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেপালি কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি শের বাহাদুর দেউবার দেশে ফেরা নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ‘জেল আদেশ’ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে নেপালে ফিরছেন। আবার কোন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘তিনি জেন জি আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।’ অথচ জেনজি আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন কেপি শর্মা ওলি। তিনি ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) তার পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এদিকে নেপালের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেউবা ও তার স্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আদালত বাতিল করে দিয়েছেন। ওই পরোয়ানার ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরছেন’—এমন উপস্থাপনাটি বিভ্রান্তিকর। তবে দেউবার বিরুদ্ধে চলমান অর্থপাচার তদন্ত পুরোপুরি বাতিল বা মামলা থেকে তাকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।
শের বাহাদুর দেউবা বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নেপালে ফিরছেন। প্রায় পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর তার এই ফেরাকে ঘিরে নেপালি কংগ্রেসের দেউবা-সমর্থক অংশ বড় ধরনের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। দেউবা ২৫ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরে তিনি হংকংয়ে অবস্থান করেন বলে জানা যায়। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভানু দেউবা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার ব্যাংকক হয়ে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে দেউবা কাঠমান্ডুতে পৌঁছাবেন।
দেউবা দম্পতির বিরুদ্ধে অর্থপাচারের তদন্ত শুরু হয় গত বছরের নভেম্বরে। তারা দেশ ছাড়ার আগেই তদন্তটি শুরু হয়েছিল। পরে অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ তাকে ও তার স্ত্রী এবং ছেলে জয়বীর সিং দেউবা এবং কয়েকজন আত্মীয়ের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সম্পদ জব্দের আদেশ এখনো বহাল রয়েছে।
এর আগেও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া নিয়ে নেপালের রাজনীতিকদের আলোচনা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা অতীতে চিকিৎসার জন্য আনুষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিদেশে গেছেন। দেউবা দম্পতিও নিয়মিত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যেতেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের জেন-জি আন্দোলনের পর ২৭ অক্টোবর দেউবা দম্পতি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। তখনও তারা চিকিৎসার কথা জানিয়েছিলেন। ৯ সেপ্টেম্বর আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে বিক্ষোভকারীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। ওই ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য তাদের বিদেশযাত্রা বলে ধারণা করা হয়েছিল। ১৪ নভেম্বর ১৮ দিন পর তারা কাঠমান্ডুতে ফিরেছিলেন।
তবে এবারের বিদেশযাত্রার সময়টি ছিল ৫ মার্চের নির্বাচনের ঠিক আগে। নির্বাচনের পরও তারা নেপালে ফেরেননি। জানুয়ারিতে নেপালি কংগ্রেসের বিশেষ সম্মেলনের মাধ্যমে দেউবা দলীয় সভাপতির পদ হারান। এরপর নির্বাচনে নেপালি কংগ্রেস বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। ক্ষমতায় আসে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি বা আরএসপি। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হন।
এ সময়ের মধ্যেই দেউবা দম্পতি সিঙ্গাপুর থেকে হংকংয়ে যান বলে ধারণা করা হয়। এপ্রিলের শেষ দিকে নেপাল সরকার হংকংয়ে নিযুক্ত কনসাল জেনারেল বিন্দেশ্বর প্রসাদ লেখককে প্রত্যাহার করে। অভিযোগ ছিল, তিনি দেউবা দম্পতিকে আতিথ্য দিয়েছেন এবং তদন্তাধীন ব্যক্তিদের সহায়তা করেছেন। দেউবা দম্পতি হংকংয়ের উপকূলীয় শহর স্ট্যানলিতে অবস্থান করছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের হংকংয়ে হাঁটার ভিডিওও বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে হংকংয়ে অবস্থানের কথা নিশ্চিত করেননি।
বালেন্দ্র শাহ সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই অর্থপাচার তদন্ত বিভাগের আবেদনের পর দেউবা দম্পতির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
পরোয়ানার খবর প্রকাশের পর ৮ এপ্রিল ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দেউবা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন যে তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের তদন্ত শুরু হয়েছে। তার ও পরিবারের সম্পদ নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। সরকারি দায়িত্বে থাকার সময় নেপালের আইন অনুযায়ী তার পরিবারের সম্পদের সঠিক হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে আছেন এবং চিকিৎসা চলমান। সময়ের সঙ্গে সত্য প্রকাশ পাবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেউবা দম্পতিকে নেপালে ফেরাতে সরকার ইন্টারপোলের রেড নোটিশ চেয়েছিল। তবে ইন্টারপোল সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। পরে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট দেউবা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিল করে দেয়।
২৫ মে নেপালের সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ দেউবা ও আরজু রানার বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিল করে তাদের ওই পরোয়ানার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দেয়। মামলাটি দেউবার করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি হয়। আদালত বলেন, অর্থপাচার তদন্ত বিভাগের তদন্ত করা অপরাধের বিচারিক এখতিয়ার বিশেষ আদালতের। ফলে কাঠমান্ডু জেলা আদালত থেকে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
আদালত আরও বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধিতে নির্ধারিত পদ্ধতি ও ফরম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। অর্থপাচার আইনের অধীন কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের জন্য পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, প্রমাণ নষ্ট করার সম্ভাবনা, তদন্তে বাধা দেওয়া বা মামলাকে প্রভাবিত করার মতো যুক্তিসংগত কারণ দেখানোর প্রয়োজন রয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেউবা দম্পতির ক্ষেত্রে এমন আইনি ভিত্তি যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এ ছাড়া অর্থপাচার তদন্ত বিভাগের তদন্তাধীন মামলার বিচারিক এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট বিশেষ আদালতের বলে আদালত উল্লেখ করেন। তদন্ত বিভাগের পক্ষ থেকে বিশেষ আদালতের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল এমন প্রমাণও আদালতের সামনে ছিল না। ফলে কাঠমান্ডু জেলা আদালতের দেওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর থাকার সুযোগ নেই বলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন।
অর্থাৎ, দেউবার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল এ তথ্য সত্য। কিন্তু সেই পরোয়ানা পরবর্তী সময়ে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে—এ তথ্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাকে ‘জেল আদেশ নিয়ে’ বা কার্যকর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরছেন বলে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দেউবা অর্থপাচার তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া থেকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি পেয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট মূলত তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বৈধতা ও তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছে। অর্থপাচার তদন্ত চলমান ছিল এবং দেউবা দম্পতিকে তদন্তে সহযোগিতা করার কথা জানাতেও হয়েছে।
দেউবা ও তার স্ত্রী পরবর্তী সময়ে নেপালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একই অবস্থান বজায় রাখেন। অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ ও দুর্নীতি তদন্ত কমিশনের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করে তারা জানান, তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে আছেন। তবে চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য দেননি।
১১ জুন দেউবা দম্পতি অর্থপাচার তদন্ত বিভাগকে ই-মেইল করে জানান, তারা নেপালে ফিরতে প্রস্তুত এবং তদন্তে সহযোগিতা করবেন। একই সঙ্গে তাদের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চান।
এর পাঁচ দিন পর, ১৬ জুন দুর্নীতি তদন্ত কমিশন কাঠমান্ডুর বুধানীলকণ্ঠে দেউবা দম্পতির বাসভবনে নোটিশ পাঠায়। পাসপোর্ট সংগ্রহসংক্রান্ত একটি মামলায় বক্তব্য দেওয়ার জন্য আরজু রানাকে তিন দিনের মধ্যে হাজির হতে বলা হয়। পরদিন ১৭ জুন তিনি ই-মেইলে জানান, চিকিৎসার জন্য বিদেশে থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাজির হতে পারবেন না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ১৭ জুন বেলা সাড়ে দুইটার দিকে কমিশন আরজু রানার ই-মেইলটি পায়। তিনি বলেন, ওই ই-মেইল ছাড়া আরজু রানার সঙ্গে অন্য কোনো মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ হয়নি।
চলমান অর্থপাচার তদন্তে দেউবার ছেলে জয়বীরের বিষয়টিও রয়েছে। ১৬ জুলাই অর্থপাচার তদন্ত বিভাগের দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়, জয়বীরের মালিকানাধীন কয়েকটি কোম্পানি বিতর্কিত ব্যবসায়ী দীপক ভাট্টার কাছ থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ নেপালি রুপি পেয়েছে। দীপক ভাট্টা বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। তদন্তকারীদের সন্দেহ, ওই অর্থ আর্থিক অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের অংশ।
এদিকে নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে আইনি লড়াইও নতুন করে শুরু হয়েছে। ১৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট গগন থাপার পক্ষকে নেপালি কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর কয়েক মাস আগে বিশেষ সাধারণ সম্মেলনের মাধ্যমে থাপা দেউবাকে দলীয় নেতৃত্ব থেকে সরিয়েছিলেন। তবে গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করেছে। ফলে বিষয়টি তিন বিচারপতির বেঞ্চে নতুন করে শুনানি হবে। নতুন শুনানির ফলই নেপালি কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্ব ও দলীয় অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দেউবা এমন সময় নেপালে ফিরছেন, যখন তার অনুসারীরা গগন থাপার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্রিয় হয়েছেন। তিনি দেশে কত দিন থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তার স্ত্রী আরজু রানা ও ছেলে জয়বীর তার সঙ্গে ফিরেন নি। এ কারণে নেপালি কংগ্রেসের কিছু নেতা মনে করছেন, দেউবা আবার হংকংয়ে ফিরে যেতে পারেন। তবে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভানু দেউবা এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা অস্বীকার করেছেন।
ভানু দেউবা বলেছেন, দেউবা আবার বিদেশে যাবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ ও দুর্নীতি তদন্ত কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দেউবা দম্পতি বিদেশে দীর্ঘ সময় কীভাবে অবস্থান করেছেন এবং তাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয়ের অর্থের উৎস কী—এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ হতে পারে।
সুতরাং, যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, শের বাহাদুর দেউবার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল এটি সত্য। কিন্তু নেপালের সুপ্রিম কোর্ট ২৫ মে সেই পরোয়ানা বাতিল করে ওই পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দিয়েছে। ইন্টারপোলও তাকে ফেরাতে রেড নোটিশ জারি করেনি। তাই ‘জেল আদেশ নিয়ে দেশে ফিরছেন’ বা ‘কার্যকর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ফিরছেন’ এ ধরনের তথ্য বিভ্রান্তিকর। একই সঙ্গে তাকে অর্থপাচার তদন্ত থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলাও সঠিক নয়। তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া আলাদা বিষয়।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, কাঠমান্ডু পোস্ট, কাঠমান্ডু পোস্ট, ইকানটিপুর