০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৪৩

ডাকটিকিটে মহানায়ক উত্তম, জন্মশতবর্ষে স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন মিঠুন-রঞ্জিতরা

মহানায়ক উত্তম কুমার  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কলকাতার রবীন্দ্রসদনে স্মরণ করা হলো কিংবদন্তি এই অভিনেতাকে। জন্মশতবর্ষের চার দিনের আয়োজনের অংশ হিসেবে ভারতীয় ডাক বিভাগ প্রকাশ করেছে উত্তমকুমারকে উৎসর্গ করা বিশেষ স্মারক খাম ও ডাকটিকিট।

একই অনুষ্ঠানে সম্মান জানানো হয় তার সময়ের একঝাঁক শিল্পী ও কলাকুশলীকে। তাদের স্মৃতিচারণে ফিরে আসে মহানায়কের সঙ্গে কাজের নানা গল্প।

৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কলকাতায় চলছে উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের বিশেষ আয়োজন। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রবীন্দ্রসদনে আয়োজন করা হয় প্রবীণ শিল্পীদের সম্মাননা, তথ্যচিত্র প্রদর্শন এবং ভারতীয় ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে উত্তমকুমারের স্মরণে বিশেষ স্মারক খাম ও ডাকটিকিট প্রকাশের অনুষ্ঠান। 

এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও পূর্ণিমা চক্রবর্তী। বাংলা চলচ্চিত্রের পরিকাঠামো নিয়েও কথা বলেন শমীক ভট্টাচার্য। বাংলা ছবিকে করমুক্ত করার পাশাপাশি জেলাগুলোতে আরও বেশি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান তিনি।

এরপর মঞ্চে সম্মান জানানো হয় উত্তমকুমারের সময়ের একঝাঁক শিল্পী ও কলাকুশলীকে। তাদের মধ্যে ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, প্রভাত রায়, দীপঙ্কর দে, রত্না ঘোষাল, শকুন্তলা বড়ুয়া, মিতা চট্টোপাধ্যায় ও কল্যাণী মণ্ডলসহ প্রবীণ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। 

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন যিশু সেনগুপ্ত ও আবীর চট্টোপাধ্যায়। একই মঞ্চে উত্তমকুমারের সহশিল্পীদের উপস্থিতিতে ফিরে আসে শুটিংয়ের দিনগুলোর স্মৃতি, সেটের গল্প এবং মহানায়কের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা।

মৌচাক ছবির প্রসঙ্গ তুলে আবীর চট্টোপাধ্যায় রঞ্জিত মল্লিককে উত্তমকুমারের সঙ্গে তার বহুল আলোচিত ধূমপানের দৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন করেন। রঞ্জিত জানান, ছবির প্রথম দৃশ্যে উত্তমকুমারের সঙ্গে শট দেওয়ার সময় তিনি কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন। তবে উত্তমকুমার নিজেই তাঁর সেই অস্বস্তি দূর করে দেন। পরে ধূমপানের দৃশ্যের শুটিংয়েও মহানায়কের সহযোগিতায় বিষয়টি সহজ হয়ে যায়।

অন্যদিকে, কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী ছবির স্মৃতিচারণ করেন মিঠুন চক্রবর্তী। উত্তমকুমারের সঙ্গে সেটিই ছিল তার প্রথম কাজ। মিঠুন জানান, ছবিটিতে তাকে বেছে নিয়েছিলেন উত্তমকুমার নিজেই। নতুন অভিনেতা হিসেবে তার মধ্যে সংশয় থাকলেও উত্তমকুমার তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন। এমনও হয়েছে, মিঠুন না খাওয়া পর্যন্ত উত্তমকুমারও খাবার খেতেন না মিঠুনের স্মৃতিতে উঠে আসে এমনই আন্তরিকতার গল্প।

অনুষ্ঠানে দেখানো হয় উত্তমকুমারকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র মহানায়ক: আ সুপারস্টার জার্নি। তথ্যচিত্রটিতে মহানায়কের জীবন ও চলচ্চিত্রযাত্রার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। ফলে পর্দায় পুরনো উত্তমকুমার আর সামনে তাঁর সময়ের শিল্পীদের উপস্থিতিতে রবীন্দ্রসদনে যেন একই সঙ্গে ফিরে আসে অতীত ও বর্তমান।

মহানায়কের জন্ম ও চলচ্চিত্রজীবন
উত্তমকুমারের আসল নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে দৃষ্টিদান ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তার অভিনয়জীবন শুরু হয়। এরপর কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। 

আরও দেখুন: যমুনা ব্যাংকে অফিসার নিয়োগ, আবেদন ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত

১৯৫৩ সালের সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে সুচিত্রা সেনের বিপরীতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে উত্তম-সুচিত্রা জুটির জনপ্রিয়তার সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে অগ্নিপরীক্ষা, হারানো সুর, সপ্তপদী, সাগরিকা, চাওয়া-পাওয়াসহ একাধিক ছবিতে তাদের জুটি দর্শকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। 

উত্তমকুমারের উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় রয়েছে সাড়ে চুয়াত্তর, অগ্নিপরীক্ষা, হারানো সুর, সপ্তপদী, নায়ক, চৌরঙ্গী, চিড়িয়াখানা, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী, ভ্রান্তিবিলাস, জতুগৃহ, অমানুষ, সন্ন্যাসী রাজা, অগ্নীশ্বর, মৌচাক, বনপলাশীর পদাবলী এবং কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী। 

বিশেষভাবে সত্যজিৎ রায়ের নায়ক (১৯৬৬) ছবিতে উত্তমকুমারের অভিনয় তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বনপলাশীর পদাবলী ছবিতে তিনি পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে কাজ করেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি হিন্দি ছবিতেও অভিনয় করেছেন উত্তমকুমার। অভিনয়ের বাইরে সংগীতের প্রতিও তার আগ্রহ ছিল গান গাওয়া ও সংগীত পরিচালনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। 

৫৩ বছরেই থেমে যায় পথচলা
দীর্ঘ ও বর্ণময় চলচ্চিত্রজীবনের ইতি ঘটে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই কলকাতায় মারা যান উত্তমকুমার। মৃত্যুর পরও তার জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি মহানায়ক হিসেবে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। 

উত্তমকুমারের জন্মের ১০০ বছর পূর্তিতে এবার তাকে স্মরণ করছে কলকাতা নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, প্রদর্শনী, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রবীণ শিল্পীদের সম্মাননার পাশাপাশি ভারতীয় ডাক বিভাগের বিশেষ স্মারক খাম ও ডাকটিকিট প্রকাশ সেই আয়োজনকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। ফলে রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে মিঠুন-রঞ্জিতদের স্মৃতিচারণ আর ডাকটিকিটে মহানায়কের মুখ—দুই মিলিয়ে জন্মশতবর্ষে যেন আবারও জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাংলা চলচ্চিত্রের সেই সোনালি সময়। তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া, ইউ এন আই।