১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০২

শামসুল হক: যে নেতার হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক যাত্রা

শামসুল হক  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের স্রোতে ক্রমেই আড়ালে চলে গেছে। অথচ একসময় রাজপথের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় তাঁরা ছিলেন সামনের সারিতে। শামসুল হক তেমনই এক বিস্মৃতপ্রায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময় তিনি হন দলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। একই সময়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদসহ কয়েকজন নেতা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে যে দলটি আওয়ামী লীগ নামে পূর্ববাংলার স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, তার সাংগঠনিক যাত্রার সূচনালগ্নে শামসুল হকের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু রাজনৈতিক জীবনের যে উচ্চতায় তিনি দ্রুত পৌঁছেছিলেন, সেখান থেকে তাঁর পতনও ছিল অস্বাভাবিক দ্রুত। ভাষা আন্দোলন, কারাবরণ, শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং শেষ জীবনের নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে শামসুল হকের জীবন হয়ে ওঠে পূর্ববঙ্গের রাজনীতির এক ট্র্যাজিক অধ্যায়।
মাইঠানের ছেলে

শামসুল হকের জন্ম ১৯১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের দেউলি ইউনিয়নের মাইঠান গ্রামে, মামাবাড়িতে। তাঁর পৈতৃক বাড়ি একই উপজেলার টেউরিয়া গ্রামে। পিতা দবিরউদ্দিন মিয়া এবং মাতা শরীফুননেসা। শৈশব থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন তিনি। টেউরিয়া ও সন্তোষ জাহ্নবী হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষে করটিয়া সাদত কলেজে পড়েন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁর শিক্ষাজীবনই তাঁকে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

চল্লিশের দশকের শুরুতে যখন ভারতবর্ষের রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন শামসুল হকও সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। মুসলিম লীগের সংগঠন বিস্তারে তিনি কাজ করেন। আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর ভূমিকা ছিল। এই সময়েই তরুণ মুসলিম রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।

মুসলিম লীগ থেকে নতুন রাজনৈতিক ধারায়
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববাংলার মানুষের রাজনৈতিক প্রত্যাশা দ্রুত বদলে যায়। মুসলিম লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার যখন ভাষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনে পূর্ববাংলার মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হতে থাকে, তখন দলটির ভেতর থেকেই বিরোধিতা বাড়তে থাকে।

এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেন হন যুগ্ম সম্পাদক। নতুন দলটি মুসলিম লীগের বাইরে একটি কার্যকর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সূচনা করে।

এখানে শামসুল হকের গুরুত্ব শুধু পদধারী নেতা হিসেবে নয়; তিনি ছিলেন ভাসানীর পর মূল সংগঠক। দলকে তৃণমূলে বিস্তার, তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করা এবং মুসলিম লীগের বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

‘টাঙ্গাইলের ওয়াটারলু’
১৯৪৯ সালের টাঙ্গাইলের উপনির্বাচন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। মুসলিম লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী (জনপ্রিয়ও বটে) খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শামসুল হক জয়ী হন। মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষের প্রথম বড় রাজনৈতিক প্রকাশগুলোর 

একটি হিসেবে এই নির্বাচনকে অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক মূল্যায়ন করেছেন। এ বিজয় তাঁকে রাতারাতি পূর্ববাংলার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত করে। তরুণ নেতা হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু এই উত্থান বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

ভাষার প্রশ্নে আপসহীন
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পূর্ববাংলায় যে আন্দোলন শুরু হয়, শামসুল হক তার প্রথম সারির নেতাদের একজন ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ধর্মঘট ও মিছিলে অংশ নিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। সেই মিছিলে তাঁর সঙ্গে ছিলেন শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতারা।

২১ মার্চ ১৯৪৮ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে  আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য দিলে শামসুল হক প্রকাশ্যেই প্রতিবাদ করেন—এমন বিবরণ তৎকালীন সংবাদ মাধ্যম ও টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত জীবনীতে পাওয়া যায়। পরবর্তী বৈঠকেও ভাষার প্রশ্নে তিনি জিন্নাহর সঙ্গে মতবিরোধে জড়ান।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কারাগার থেকে শুরু এক অন্ধকার অধ্যায়
শামসুল হকের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাঁক আসে কারাবন্দ অবস্থায়। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘ কারাবাসের সময় তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে তিনি আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

এখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—একজন সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক নেতা কীভাবে এত দ্রুত রাজনৈতিক পরিসর থেকে হারিয়ে গেলেন?

একদিকে ছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, অন্যদিকে দীর্ঘ কারাবাস ও চিকিৎসার সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। এসব ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত ছিল, তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লেখায় নানা ব্যাখ্যা এসেছে। তবে সব দাবির পক্ষে সমান শক্তিশালী দলিল নেই। ফলে তাঁর মানসিক বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

আফিয়া খাতুন ও পারিবারিক জীবন
শামসুল হকের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তার বিয়ে। ১৯৪৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শামসুল হক বিয়ে করেন আফিয়া খাতুনকে। আফিয়া খাতুন ছিলেন শিক্ষিত নারী। তিনি ইডেন কলেজে ইংরেজির শিক্ষকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শামসুল হকের পূর্বপরিচিত।

দাম্পত্য জীবনে ১৯৫১ সালের ৯ এপ্রিল শামসুল হক ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন আফিয়া খাতুন প্রথম কন্যা সন্তানের জনক-জননী হন। তাঁদের প্রথম মেয়ে উম্মে বতুল তাজমা তাহেরা—‘শাহীনে’র জন্মের সময় শামসুল হক কারাবাসে ছিলেন।

দ্বিতীয় কন্যা উম্মে বতুল ফাতেমা জহুরা—‘সায়কা’ ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৫২ জন্মগ্রহণ করেন। এই মেয়ের জন্মের সময়ও শামসুল হক কারাগারে ছিলেন। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের বিবাহিত জীবনের মধ্যেই রাজনৈতিক আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও কারাবাস তাঁর পারিবারিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

শামসুল হকের স্ত্রী আফিয়া খাতুন পরবর্তী জীবনে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন এবং আনোয়ার এস দিলকে বিয়ে করেন। আনোয়ার এস দিলের সঙ্গে তিনি Bengali Language Movement and the Creation of Bangladesh গ্রন্থটি লেখেন।

তাঁদের দুই কন্যাও পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন। ২০২৩ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে— ড. শাহীন ফাতেমা দিল—হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং ড. শায়েকা দিল ভার্টিলেক—নাসার অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট হিসেবে। 

পরবর্তী সময়ে শামসুল হকের অসুস্থতা ও পারিবারিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে নানা বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে শামসুল হকের পারিবারিক জীবন নিয়ে প্রচলিত কিছু নাটকীয় বিবরণ যাচাইযোগ্য প্রাথমিক দলিলের তুলনায় স্মৃতিচারণ বা পরবর্তী লেখার ওপর বেশি নির্ভরশীল। 

রাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরে
মানসিক অসুস্থতার পর শামসুল হক আর আগের সেই সংগঠক ও বক্তা থাকেননি। একসময় যিনি হাজারো মানুষকে সংগঠিত করতে পারতেন, পরবর্তী জীবনে তাঁকে প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাটাতে হয়—এমন বর্ণনা একাধিক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় রয়েছে।

এটি কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; তৎকালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। যে নেতার সাংগঠনিক দক্ষতা একটি নতুন রাজনৈতিক দলের ভিত্তি গঠনে কাজে লেগেছিল, তাঁর বিপর্যয়ের সময়ে রাষ্ট্র কিংবা তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা কতটা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন—এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসে খুব উজ্জ্বল নয়।

শেষ অধ্যায়ও রহস্যে ঢাকা
শামসুল হকের মৃত্যুসংক্রান্ত তথ্যেও দীর্ঘদিন বিভ্রান্তি ছিল। কিছু প্রকাশিত সূত্রে বলা হয়েছে, ১৯৬৪ সালের দিকে তিনি নিখোঁজ হন এবং তাঁর পরিণতি নিয়ে দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তা ছিল। আবার সরকারি ও স্থানীয় সূত্রে তাঁর মৃত্যুর সাল ১৯৬৫ উল্লেখ করা হয়েছে।

টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় অনুসন্ধান ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে পরবর্তীকালে তাঁর কবর চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর শেষ জীবনের পূর্ণাঙ্গ, দলিলনির্ভর বিবরণ এখনো ইতিহাসের একটি অসম্পূর্ণ অধ্যায়।

যে দলের ইতিহাসে তাঁর নাম থাকা উচিত
আজকের আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু নেতার নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু সেই ইতিহাসের প্রারম্ভিক সাংগঠনিক অধ্যায়ে শামসুল হকের নামও অনিবার্য।

১৯৪৯ সালে তিনি যে দলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন, সেই দলই ১৯৫৫ সালে নাম থেকে ‘মুসলিম’শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে এই দলই বাঙালির স্বাধিকার, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়।
অর্থাৎ শামসুল হক স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির শেষ অধ্যায়ের নেতা নন; তিনি সেই রাজনৈতিক ধারার প্রথম দিকের নির্মাতাদের একজন।

ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো
শামসুল হকের জীবনকে এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তিনি ছিলেন মুসলিম লীগের সংগঠক, পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী, আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং ভাষা আন্দোলনের নেতা। আবার একই জীবনে তিনি হয়েছেন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার, দীর্ঘ কারাবাসে বিপর্যস্ত একজন মানুষ এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় বিস্মৃত এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

তাঁর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো এখানেই—যে রাজনৈতিক আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত নির্মাণে তিনি নিজের যৌবন ব্যয় করেছিলেন, সেই আন্দোলনের পরবর্তী ইতিহাসে তাঁর নাম ক্রমেই পেছনে চলে যায়।

ইতিহাসের বিচারে শামসুল হকের গুরুত্ব তাই কেবল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নয়। তিনি এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন পূর্ববাংলার মুসলিম রাজনীতি ধীরে ধীরে ভাষা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে এগোচ্ছিল। সেই রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে শামসুল হক ছিলেন সামনের সারির একজন কর্মী ও সংগঠক।

আর তাঁর করুণ পরিণতি মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতির ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের কাহিনী নয়; কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লুকিয়ে থাকে সেইসব নেতার জীবনে, যাঁরা ইতিহাসের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, কিন্তু ইতিহাসের আলোয় নিজেরা শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি।

অনুসন্ধানভিত্তিক বর্ণনায় বলা হয়, ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ শামসুল হক অসুস্থ মাকে দেখতে টাঙ্গাইলে নিজ বাড়িতে এসেছিলেন। পরদিন তিনি আবার চলে যান। এরপর পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখান থেকেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায় শুরু। পরিবার জানত না তিনি কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন কিংবা তাঁর পরিণতি কী হয়েছে।

সরকারি জীবনী অনুযায়ী, জীবনের শেষ পর্যায়ে অসুস্থ শামসুল হক তৎকালীন টাঙ্গাইল মহকুমার কালিহাতী এলাকার জোগারচর-কদিমহামজানি অঞ্চলে আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁর পরিচিত স্বদেশি আন্দোলনের কংগ্রেস নেতা মৌলভি মহির উদ্দিন আনসারীর বাড়িতে তিনি অবস্থান করেন। আনসারীর ছেলেরা স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শামসুল হক মৃত্যুবরণ করেন।