গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলায় আওয়ামী নেতাকর্মীদের হামলার শিকার ড. মাহবুবউল্লাহ জাতীয় অধ্যাপক
গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান ও কথা বলায় অতীতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের স্বৈরশাসনামলে লাঞ্ছনা ও হামলার শিকার হয়েছিলেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। এক সময় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নৃশংসভাবে নিগৃহীত সেই ড. মাহবুবউল্লাহ অবশেষে মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মানে ভূষিত হলেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-১ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
সিনিয়র সহকারী সচিব নাঈমা খন্দকার স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয় অধ্যাপক নীতিমালা-২০২৩ অনুযায়ী প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহকে নিয়োগের তারিখ হতে ৫ বছরের জন্য নিম্নবর্ণিত শর্তে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হলো।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- ‘তিনি সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে বিবেচিত হবেন না। তিনি কোন গবেষণা সংস্থা বা শিক্ষায়তনের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে নিজের পছন্দমত ক্ষেত্রে গবেষণামূলক কাজ করবেন এবং তিনি তার গবেষণা কাজের ক্ষেত্র মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে অবহিত করবেন’, ‘তিনি যে গবেষণা সংস্থা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত থাকবেন সেই সংস্থা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিকট তার শিক্ষা/গবেষণামূলক কাজের অগ্রগতির বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ করবেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থা/শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যানকে তার কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত রাখবেন এবং গবেষণালবন্ধ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে প্রেরণ করবেন’, ‘জাতীয় অধ্যাপক পদে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে তিনি জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ এর গ্রেড-১ অনুযায়ী বেতন-ভাতাদি ও অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্য হবেন’, ‘তিনি স্বীয় পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন সময়ে অন্য কোন বেতনভুক্ত চাকরি করতে পারবেন না’। জনস্বার্থে জারীকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে বিএনপির ওই সময়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ছিল। এতে আলোচক ছিলেন অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। প্রকাশনা অনুষ্ঠান শেষে মিলনায়তন থেকে দুপুরে বের হওয়ার পর দুর্বৃত্তরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে তাঁকে। ওই অবস্থাতেই তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে যান। সেখানে বিএনপিপন্থী প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (এ্যাব) পূর্ব নির্ধারিত মহাসমাবেশ চলছিল। বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া তখন মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। এ সময় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ ছেঁড়া শার্ট পরিহিত অত্যন্ত হতবিহ্বল অবস্থায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে প্রবেশ করেন। এ সময় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহকে খুব বিচলিত ও অসহায় দেখাচ্ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক ও দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহকে এ অবস্থায় দেখে তাৎক্ষণিক ওই হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন খালেদা জিয়া। পাশপাশি তিনি এই ঘটনার বিচার দাবি করেন।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মাহবুব উল্লাহ বলেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান শেষে মিলনায়তনের বাইরে এলে হঠাৎ করে তিনজন দুর্বৃত্ত তার ওপর চড়াও হয়। তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। তারা হামলা চালিয়ে তার পোশাক ছিঁড়ে ফেলে। তিনি হামলাকারীদের চেনেন না। পরে আশপাশে থাকা লোকজন এগিয়ে গেলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
বিএনপিপন্থি প্রকৌশলীদের সংগঠন ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসমাবেশে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেন, ‘দেশে কেউ এখন নিরাপদ নয়। তাই আমাদের ঘরে বসে থাকলে চলবে না। ঐক্যবদ্ধভাবে এর প্রতিরোধ করতে হবে।’
হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, যদি হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হয় তাহলে বুঝতে হবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর নির্দেশেই এ হামলা হয়েছে। পরে মাহবুব উল্লাহকে রাজধানীর গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এক সময়ে সক্রিয় বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত পরবর্তী জীবনে শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ। তিনি ১৯৬৯-৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের 'মেনন গ্রুপে'র সভাপতি ছিলেন। সে সময় ছাত্র ইউনিয়ন দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত ছিল—একটি মতিয়া চৌধুরী গ্রুপ (মস্কোপন্থি) এবং অন্যটি রাশেদ খান মেনন গ্রুপ (পিকিংপন্থী/মাওবাদী)। এর পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রে। সেখানে ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) আয়োজিত সভার প্রসঙ্গে মাহবুব উল্লাহর নাম উল্লেখ রয়েছে। একই দলিলে সামরিক সরকার তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল বলেও উল্লেখ আছে, যা তার ওই ধারার নেতৃত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বিএনপির প্রায় সব গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতেন এবং অনেক আলোচনা সভায় বক্তব্যও রাখতেন। বিএনপির মরহুমা চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহম্মেদ, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহসহ গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেয়া এসব শিক্ষাবিদদের মূল্যায়ন করতেন, সম্মান দিতেন।
এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সমিতির সুপারিনটেনডেন্ট নিমেশ চন্দ্র দাশ ওইদিন (২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এ ঘটনার নিন্দা জানান বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরাও।