ফার্স্ট লেডির সংজ্ঞা, মাপকাঠি বদলে দিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ফার্স্ট লেডি শব্দটা শুনলে আমাদের চোখে সাধারণত একজন গৃহবধূ বা রাষ্ট্রপতির ছায়া সঙ্গীর ছবিটাই ভেসে ওঠে। আলাদাভাবে তার পরিচয় পাওয়া কঠিন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুযোগ্য সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান সেই প্রচলিত চিত্রকে রীতিমতো পাল্টে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হওয়ার সংজ্ঞা আর সেই রোল মডেলের মাপকাঠি তিনি চিরতরে বদলে দিয়েছেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। তাই তার স্ত্রী অফিশিয়াল ফার্স্ট লেডি। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর পত্নী বা স্পাউস অফ দ্য প্রাইম মিনিস্টার বলা হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে কেন ফার্স্ট লেডির মতো আলোচনা হচ্ছে তার কারণ হল তার প্রটোকল এবং ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড। গেল মার্চ মাসে তিনি যখন হোয়াইট হাউসে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সম্মেলনে যোগ দেন তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং কূটনৈতিক মহলে তাকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে ফার্স্ট লেডির গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শুধু বাংলাদেশেই নয় পৃথিবীর অনেক দেশে যেমন দক্ষিণ কোরিয়া বা ফ্রান্স যেখানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বেশি সেখানে জনগণের কাছে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী কার্যত ফার্স্ট লেডির মতো সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশে বর্তমানে ডা. জুবাইদা রহমানের ক্ষেত্রে সেটি ঘটছে।
বেগম খালেদা জিয়া কিংবা রওশন এরশাদ পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। ঠিক কিন্তু ফার্স্ট লেডি থাকার সময়ে তারা তাদের স্বামীর ছায়াতেই ছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালে বাংলাদেশ নতুন এক ফার্স্ট লেডিকে দেখছে। যিনি অফিশিয়ালি বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি না হলেও দেশে-বিদেশে তিনি ফার্স্ট লেডির মর্যাদা পাচ্ছেন। যিনি কেবল প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী নন বরং নিজের মেধা পারিবারিক ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতায় তৈরি করেছেন এক স্বতন্ত্র পরিচয়।
ডা. জুবাইদা রহমানের এই আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে তার অত্যন্ত সমৃদ্ধ পারিবারিক ইতিহাস। অনেকে মনে করেন রাজনৈতিক ঐতিহ্যের দিক থেকে তার স্বামী তারেক রহমানের চেয়েও তিনি বেশি ঋদ্ধ।
ডা. জুবাইদা রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭২ সালের ১৮ জুন সিলেটের সম্ভ্রান্ত এবং ঐতিহ্যবাহী এক মুসলিম পরিবারে। তার বাবা প্রয়াত রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর থেকে ১৯৮৪ সালের ৬ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান নৌবাহিনীর প্রধানের পাশাপাশি এরশাদ সরকারের যোগাযোগ ও কৃষি মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে নৌবাহিনী ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ এবং বঙ্গোপসাগরের অন্যান্য উদীয়মান দ্বীপগুলোর ওপর বাংলাদেশের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
ডা. জুবাইদা রহমানের দাদা আহমেদ আলী খান ১৯০০ সালে ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। আহমেদ আলী খান ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম মুসলিম ব্যারিস্টার। পাশাপাশি তিনি ছিলেন আসাম কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট এবং ভারতের আইন পরিষদের সদস্য অর্থাৎ এমএলএ। তার আরেক দাদা আজমল আলী চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। ভারতবর্ষের প্রথম মুসলিম বিচারপতি সৈয়দ আমির আলী ডা. জুবাইদা রহমানের পরদাদা। এই সম্পর্কে হাসিনা আমলের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ছিলেন জুবাইদা রহমানের চাচা।
শুধু তাই নয় বাংলাদেশের সর্বকালের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী ছিলেন জুবাইদা রহমানের চাচা।
ডা. জুবাইদা রহমানের মা বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে ‘সুরভি’ (Surovi) নামে একটি অন্যতম প্রাচীন ও বিশিষ্ট অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ তাদের পারিবারিক নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয়। মূলত সুবিধাবঞ্চিত ও গৃহকর্মী শিশুদের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। সুরভি মূলত শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্য কাজ করে। প্রায় ২৮ লাখ শিশুকে স্বাক্ষরতার আওতায় এনেছে এবং ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিভিন্ন স্কুল পরিচালনা করে। তরুণদের স্বাবলম্বী করতে Surovi IT Center-এর মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রদান করে। শিশুদের বিকাশ ও সুরক্ষায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করে। নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, নারীদের ক্ষমতায়ন এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে যুক্ত। দীর্ঘ প্রায় ৪৭ বছর ধরে শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে এবং অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সুরভী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
এর বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব আইরিন জোবেদা খান তার আপন চাচাতো বোন। অর্থাৎ কূটনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক নেতৃত্বের যে প্রভাব তা জুবাইদা রহমানের রক্তে মিশে আছে।
১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তার পারিবারিক রাজনৈতিক বন্ধন আরো মজবুত হয়।
জুবাইদা রহমান নিজে পেশায় একজন মেধাবী চিকিৎসক। ১৯৯৫ সালে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর তিনি লন্ডনের বিশ্ব বিখ্যাত ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে মেডিসিনে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন। গবেষণা ও চিকিৎসায় তার দক্ষতা ইতোমধ্যে তাকে একজন পেশাজীবী ফার্স্ট লেডি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর এই পেশাদারিত্বই তাকে স্বামীর ছায়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।
ডা. জুবাইদা রহমান সুযোগ পেলেই রাজনীতির অঙ্গনে কাজ করেছেন। লন্ডনে স্বামীর সঙ্গে নির্বাসনে যাওয়ার আগে দেশে থাকাকালীন তিনি বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ ড্যাবের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। গেল ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজধানীর হাতিরঝিলে পেশাজীবীদের সম্মেলনে তার প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্যও সবার নজর কাড়ে। সেখানে তিনি বিনয়ের সঙ্গে রাজনীতির গতি প্রকৃতি ও জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন। তিনি বিএনপির রাজনীতিকে সুষ্ঠু পরিকল্পনার রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডা. জুবাইদা রহমান এখনো সরাসরি দলীয় রাজনীতি ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও তার শব্দের বাচনভঙ্গি পরিণত ও শক্তিশালী। গতানুগতিক ফার্স্ট লেডিদের আমরা প্রধানত ঘরোয়া ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনে দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু জুবাইদা রহমান সেই ধারণা পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছেন। গত মার্চে হোয়াইট হাউসে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে ফাস্টারিং দ্য ফিউচার টু টুগেদার গ্লোবাল কোয়ালিশন সামিটে যোগ দেন ডা. জুবাইদা রহমান। এই সফরটি বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডির ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। সেখানে তিনি কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে নয় বরং উন্নয়নশীল দেশের শিশুদের অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। তার ভাষণে তিনি বলেছেন- প্রত্যেক জাতির ভবিষ্যৎ তার শিশুদের জীবনের গল্পে লেখা থাকে। সেখানে শিশু শিক্ষা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়েও তিনি বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সত্যি বিরল ঘটনা যেখানে কোনো ফার্স্ট লেডি সরাসরি বিশ্ব মঞ্চে এভাবে নীতি নির্ধারণী সংলাপ করছেন।
অন্যান্য ফার্স্ট লেডি থেকে ডা. জুবাইদা রহমান কেন একেবারে আলাদা এর ব্যাখ্যায় বলা যায়, প্রথমতঃ শিক্ষা ও পেশাদারিত্ব। শিক্ষা ও পেশাদারিত্ব একজন চিকিৎসক হিসেবে তার যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অন্যান্যদের থেকে আলাদা করেছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তিনি যে প্রস্তাবনাগুলো রেখেছেন সেগুলো বেশ পেশাদার এবং বাস্তবসম্মত। দ্বিতীয়তঃ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কও তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে ভূমিকা রেখেছে। আপন চাচাতো বোন আইরিন খানের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ক্ষেত্রে ব্যাপক অভিজ্ঞতা আর নিজের দীর্ঘদিনের ইংল্যান্ডে প্রবাস জীবন তাকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের ভাষা বুঝতে সাহায্য করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব আইরিন খানের সাথে তার সম্পর্ক জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ের ফোরামে যোগাযোগ তাকে বিশ্বমঞ্চে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। তৃতীয়তঃ নিখাদ নেতৃত্বগুণ। হাতিরঝিলে তার ভাষণ হোক বা ওয়াশিংটনের বৈঠক তিনি নির্ভার ও পরিমিত গলায় কথা বলেন। তিনি কৌশলগতভাবে সফট পাওয়ার ব্যবহার করছেন। শিক্ষা জনস্বাস্থ্য এবং শিশু উন্নয়নকে মূল মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতিতে না গিয়েও তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জুবাইদা রহমান হচ্ছেন প্রথম একজন প্রফেশনাল ফার্স্ট লেডি যিনি নিজস্ব পরিচয়কে স্বামীর পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেননি বরং সেই পরিচয়কে নিজের মেধা এবং কর্মদক্ষতা দিয়ে আরো মজবুত করেছেন।
শাশুড়ি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে যেমন আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেকে তৈরি করেছিলেন ঠিক তেমনি জুবাইদা রহমানও আগামী নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় ভূমিকায় আসবেন কিনা সময়ই বলবে সেই উত্তর।
তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হওয়ার সংজ্ঞা আর সেই রোল মডেলের মাপকাঠি তিনি চিরতরে বদলে দিয়েছেন। ইতিহাসের পাতা উল্টালে হয়তো আমরা অনেক যোগ্য নারীকে পাওয়া যাবে যারা পর্দার আড়ালে থেকেও ক্ষমতার রাজনীতিতে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু সময়ের চ্যালেঞ্জ মেনে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং এবং সমকালীন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে ডা. জুবায়দা রহমানের চেয়ে উপযুক্ত উদাহরণ আর হয়তো নেই।