২৩ জুন ২০২৬, ২১:২৫

ফেসবুক-টেলিগ্রামে বিক্রি হচ্ছে ভোটার তালিকা, তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

ফেসবুকে প্রচারিত ভোটার তালিকা বিক্রির বিজ্ঞাপন  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

ফেসবুক ও টেলিগ্রামে বাংলাদেশের ভোটার তালিকা অবাধে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে নাগরিকদের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, পেশা ও ভোটার নম্বরসহ সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে ছড়ানো হচ্ছে। এতে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তথ্য যাচাইকারী ও ডিজিটাল মিডিয়া গবেষণা সংস্থা ‘ডিসমিসল্যাবে’র অনুসন্ধানভিত্তিক একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা সামাজিক মাধ্যমে মাত্র ৩০ থেকে ২৫০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হচ্ছে। বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে আসনভিত্তিক ও সারাদেশের ভোটার তালিকার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, এমনকি ফেসবুক অ্যাড চালিয়েও প্রচারণা চলছে।

একটি ঘটনায় ২৫০ টাকা পাঠানোর পর ক্রেতাকে গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে বিভাগভিত্তিক ফোল্ডারে সাজানো ভোটার তালিকা সরবরাহ করা হয়। যাচাই করে দেখা গেছে, তালিকায় থাকা তথ্য ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকার সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে।

‘ডিসমিসল্যাবে’র অনুসন্ধানে আরও অন্তত ৫০০টির বেশি পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন গ্রুপ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ভোটার তালিকা বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে টেলিগ্রাম গ্রুপেও এসব তথ্য ফ্রিতে ছড়িয়ে দেওয়ার নজির পাওয়া গেছে।

নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, আমরা ভোটার তালিকা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রত্যেক প্রার্থীকে পিডিএফ আকারে প্রদান করেছিলাম। সেখানে ভোটারদের ছবি নেই। কোনো প্রার্থী এটা কোনো গ্রুপকে বা কাউকে দিয়ে বা বিক্রি করে থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের এখান থেকে এরকম বিক্রি করার মতো কোনো অনুমতি নাই।

মোঃ রুহুল আমিন মল্লিক আরও জানান, আমার অনুমান, ভোটার তালিকা ছাপানোর জন্য কোনো কম্পিউটারের দোকানে প্রার্থীরা গেছে। তখন কম্পিউটারের দোকানদাররা এটা কপি করে রেখে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের তথ্য ফাঁসের ফলে জাল পরিচয়পত্র তৈরি, ব্যাংক জালিয়াতি, অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং এবং বিভিন্ন সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন সতর্ক করে বলেন, ফাঁস হওয়া তথ্যের সাহায্যে অপরাধীরা ভুয়া আইডি কার্ড তৈরি করে বিভিন্ন পরিষেবার জন্য চেষ্টা চালাতে পারে, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি করা থেকে শুরু করে কারো অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত নিয়ে নিতে পারে। এমনকি এই তথ্যের অপব্যবহার করে অন্যের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন সাইবার অপরাধও করা সম্ভব। অর্থাৎ নাগরিকরা মারাত্মক আর্থিক, মানসিক এবং আইনি ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন।

নাগরিকদের এসব ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কি করা উচিৎ? এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য (এনআইডি, ভোটার তালিকা, জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত তথ্য) সংগ্রহ করে, তাদের তথ্য সংগ্রহের সাথে সাথে এর সুরক্ষায়ও নজর রাখা ও বাজেট বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে কিনা সেটিও নিয়মিত অডিট করা প্রয়োজন।