৫০০ কুমিরের অভয়াশ্রম, সেখানেই হবে অলিম্পিক গেমসের ইভেন্ট
অস্ট্রেলিয়ার রকহ্যাম্পটনের ফিটজরয় নদীতে রাজত্ব প্রায় ৫০০ নোনাপানির কুমিরের। ভয়ংকর এসব কুমিরের আবাসস্থল হিসেবেই পরিচিত নদীটিতে এবার বসতে যাচ্ছে অলিম্পিকের আসর। ২০৩২ ব্রিসবেন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক গেমসে রোয়িং ও ক্যানো স্প্রিন্ট আয়োজনের জন্য ফিটজরয় নদীকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ভেন্যুটি ব্রিসবেন থেকে প্রায় ৫৬৫ কিলোমিটার দূরে।
গেমস ইনডিপেনডেন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন অথরিটির একটি স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের পর নদীটিকে ক্যানোয়িংয়ের উপযুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই মূল্যায়নে কুমিরের উপস্থিতিকে মূল বিবেচনায় রাখা হয়নি। বরং অলিম্পিকের সময় এবং তার আগের সময়ে আবহাওয়া, পানির স্তর ও বন্যার ঝুঁকি নিয়ে মূলত পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ফিটজরয় নদীকে একটি ‘ফ্ল্যাটওয়াটার ফ্যাসিলিটি’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ এখানে পানির স্রোত তুলনামূলক কম। জায়গাটি এরই মধ্যে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রোয়িং কার্যক্রমের জন্য পরিচিত। এখানে নিয়মিত স্কুলপর্যায়ের প্রতিযোগিতা, স্থানীয় রেগাটা এবং জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নদীটি নিয়মিত রোয়িংয়ের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় কুমির দেখা গেলে নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট জরুরি ব্যবস্থা বা ‘কন্টিনজেন্সি প্ল্যান’ রয়েছে। অলিম্পিকের অ্যাথলেটদের নিরাপত্তা নিয়েও কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন।
ফিটজরয় নদীকে অলিম্পিকের ভেন্যু হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে ওয়ার্ল্ড রোয়িং এবং প্যাডেল ওয়ার্ল্ডওয়াইড, যা আগে ইন্টারন্যাশনাল ক্যানো ফেডারেশন নামে পরিচিত ছিল।
ওয়ার্ল্ড রোয়িংয়ের সভাপতি জিন-ক্রিস্টোফ রোল্যান্ড বলেন, ‘বিস্তৃত বিশ্লেষণের পর আমরা নিশ্চিত যে অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক রোয়িংয়ের নিয়ম মেনে ফিটজরয় নদী একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা উপহার দিতে সক্ষম।’
অন্যদিকে প্যাডেল ওয়ার্ল্ডওয়াইডের সভাপতি টমাস কোনিয়েটজকো বলেন, ‘কারিগরি মূল্যায়নের পর অ্যাথলেটদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। ক্যানো স্প্রিন্টের জন্য এটি চমৎকার একটি ট্র্যাক হতে যাচ্ছে।’
তবে ফিটজরয় নদীর কুমির নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। নদীতে থাকা নোনাপানির কুমির স্থানীয়ভাবে ‘সল্টি’ নামে পরিচিত। এসব কুমির স্বাদু ও লোনা—দুই ধরনের পানিতেই বিচরণ করতে পারে এবং দৈর্ঘ্যে ছয় মিটারের বেশি বড় হতে পারে। দুই বছর আগেও নদীর উজানে প্রায় চার মিটার লম্বা একটি কুমির ধরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
গত বছর ফিটজরয় নদীতে বিশাল আকৃতির কুমিরের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ব্রিসবেন ২০৩২-এর সভাপতি অ্যান্ড্রু লিভারিস বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সমুদ্রে তো হাঙরও থাকে, তাই বলে কি আমরা সার্ফিং বন্ধ রাখি? “পারব না” মানসিকতা বাদ দিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করুন।’
ভেন্যু চূড়ান্ত হওয়ার পর অ্যান্ড্রু লিভারিস বলেন, ‘এই স্বীকৃতি আমাদের পরিকল্পনাকে এক ধাপ এগিয়ে দিল।’
ফিটজরয় নদীতে রোয়িং আয়োজনের পক্ষে আরও একটি যুক্তি হলো খরচ। অস্ট্রেলিয়ার লিবারেল রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, বিদ্যমান এই নদী ব্যবহার করলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন কমবে এবং এতে বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে।
গত জানুয়ারিতে ন্যাশনালস কুইন্সল্যান্ডের সিনেটর ম্যাট ক্যানাভান বলেছিলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, রোয়িং ও ক্যানোইং রকহ্যাম্পটনের কেন্দ্রস্থলে থাকা একটি বিদ্যমান স্থাপনায় নিয়ে গেলে প্রায় ১০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব।’
ফিটজরয় নদীতে রোয়িং আয়োজন করা হলে ইভেন্টটি নিউ সাউথ ওয়েলসের পেনরিথে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। রোয়িং কুইন্সল্যান্ড ও রোয়িং অস্ট্রেলিয়া গেমসের সময় কুইন্সল্যান্ডেই এই খেলা রাখার অনুরোধ জানিয়ে স্থানীয় সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে।
ফিটজরয় রোয়িং ক্লাবের সভাপতি সারাহ ব্ল্যাকও মনে করেন, কুমিরের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও নদীটিতে নিরাপদে অলিম্পিক রোয়িং আয়োজন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘ফিটজরয় কুমিরের প্রাকৃতিক আবাসস্থল, আমরা বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবেই জানি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। সেখানে এটিকে কুমিরে আক্রান্ত বা কুমিরে ভরা নদী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।’
সারাহ ব্ল্যাক বলেন, ‘এখানে আমরা নিয়মিত পরিবেশ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। তাদের কর্মকর্তারা নিয়মিত নদীতে জরিপ চালান।’
তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিটি ব্যবস্থাপনার আওতায় রয়েছে এবং আমাদের খেলাধুলার ক্ষেত্রেও আমরা এ ধরনের ঝুঁকি বেশ ভালোভাবে সামাল দিই।’
তবে অলিম্পিকের আগে ফিটজরয় নদীকে ওয়ার্ল্ড রোয়িংয়ের কঠোর নিয়ম পূরণ করতে হবে। নোনাপানির কুমিরের উপস্থিতির পাশাপাশি আরও কিছু কারিগরি বিষয়ও ভেন্যুটির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এর আগে ফিটজরয় নদীতে অস্ট্রেলিয়ার রোয়িং দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হয়েছে। প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিকে অস্ট্রেলিয়ার রোয়িং দল একটি পদক জিতেছিল। নারীদের কক্সলেস পেয়ার ইভেন্টে তারা ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিল।
২০২১ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সদস্যরা ভোট দিয়ে ২০৩২ সালের অলিম্পিক গেমসের আয়োজক শহর হিসেবে ব্রিসবেনকে নির্বাচিত করেন। অস্ট্রেলিয়া তৃতীয়বারের মতো গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আয়োজন করতে যাচ্ছে। এর আগে ১৯৫৬ সালে মেলবোর্ন এবং ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিক আয়োজন করেছিল।