১২ জুলাই ২০২৬, ২০:২৫

দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ: বাঙালির উন্মাদনা ও ক্রীড়া প্রকল্প 

নাজমুল হুদা আজাদ। শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি  © টিডিসি সম্পাদিত

‘আমরা বাঙালি জাতি। অনুকরণে আমাদের জুড়ি মেলা ভার। আমরা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর স্টাইল গ্রহণ করি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো হতে চাই না।’

চলছে বিশ্বকাপ; দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। এ বিশ্বের আনাচে-কানাচে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। যদিও এই উন্মাদনা আমাদের মধ্যে একটু বেশিই। অনেকক্ষেত্রে এই উন্মাদনা বিপথগামী।

যেহেতু আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বিশ্বকাপের মঞ্চে নেই, আবার বিশ্বকাপের মঞ্চ মাতানোর মতো কোনো স্বপ্নালু প্রকল্পও আমাদের নেই। আমরা এই মুহূর্তে যে যার মতো প্রিয় দলগুলোকে সমর্থন জুগিয়ে আনন্দ ও উদযাপনের অংশীদার হচ্ছি। যেহেতু বাঙালির আনন্দ উদযাপনের উপায়-অনুষঙ্গ খুবি সীমিত, আবার যা আছে তাতেও রাজনৈতিক, সামাজিক- সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাঁধাবিপত্তি আরোপের অপচেষ্টার কমতি নেই। সেহেতু ফুটবল বিশ্বকাপের এই বৈশ্বিক উন্মাদনার অংশ হওয়াটা ভালোই। বিপত্তি বাঁধে তখন, যখন আমরা এখানেও অনিবার্যভাবে রাজনীতি ও ধর্মের বাঁধা- বিপত্তি আরোপে তৎপর হয়ে উঠি। এটা সত্য যে বাঙালির অসহায়ত্বের সর্বশেষ ঠিকানা ধর্ম। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করেও আমরা আমাদের এই ধর্মীয় দ্বিচারিতা চর্চায় তৎপর। আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে গান- নাচ করবো না ( বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের একটা অংশ), কিন্তু গান- নাচের সবচে বড়ো ভোক্তা আমরা। আমরা খেলবো না, কিন্তু খেলা দেখে ধর্মের আলোকে খেলাটাকে ব্যাখ্যা করবো। সাথে সুযোগ পেলেই রাজনীতিটাও একটু চর্চা করে ফেলবো।

আমরা একটা দল বা একজন ব্যক্তি খেলোয়াড়কে সমর্থন করা মানে এই না যে বাকি দল বা খেলোয়াড় খড়কুটো। নিজের সমর্থিত দল বা ব্যক্তি খেলোয়াড়কে মহিমান্বিত করতে অপর দল বা অপর ব্যক্তি খেলোয়াড়কে তাচ্ছিল্য করতে হয় না। বা অপর দল বা অপর ব্যক্তি খেলোয়াড়কে ছোটো করলেই নিজের সমর্থিত দল বা ব্যক্তি খেলোয়াড় মহিমান্বিত হয়ে ওঠে না। এই টক্সিসিটি চর্চাটা এখন এমন জায়গায় গেছে যে, খেলাকে কেন্দ্র করে পক্ষ- প্রতিপক্ষের মারামারি বা সংঘর্ষ বাংলাদেশের বেশ ক'টা জায়গায় কয়েকজনের প্রাণ পর্যন্ত গেছে। এতে লাভটা কী বা লাভটা কার হলো! দুঃখজনকভাবে না নিজেদের লাভ, না সমর্থিত দলের লাভ। ক'টা দিন পর বিশ্বকাপ শেষ হবে। আপনার সমর্থন- অসমর্থনে কারো কোনো বিশেষ লাভ- ক্ষতি হবে না। কিন্তু সমর্থন- অসমর্থনকে কেন্দ্র করে যদি আপনি বা আপনার দ্বারা অন্যকেউ ভিক্টিম হয় তবে আপনি বা আপনার পরিবার অথবা অন্যকেউ বা অন্যকারো পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই বিবেচনায় আমাদের সবার উচিত খেলাটাকে নির্মল আনন্দের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে খেলার নির্মল আনন্দটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপভোগের চেষ্টা করা।

বিশ্বকাপের মাঝেই কিছু আশাজাগানিয়া ব্যাপারও আছে। এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে  আমরা এমন ক'জন রত্নের সন্ধান পেয়েছি যারা খেলাটাকে পেশনেটলি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা বেশ ভালো। দেশের ফুটবলের এই দৈন্যদশার যুগে তাঁদেরকে ফুটবলের এই বেগতিক অবস্থা থেকে উত্তরণে কীভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে তাও বিবেচনার একটা সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আবার ক্রীড়াপ্রেমী যে বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের এই আবেগকে সুপথে পরিচালিত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের খেলাধুলার উন্নয়ন নিশ্চিতে একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাবনার জায়গাটাও সহজ ও বাস্তবায়নযোগ্য। তরুণদের মধ্যে বর্তমানে যে পরিমাণে মাদক ও জোয়ার ছড়াছড়ি তা থেকে উত্তরণের একটা আশাজাগানিয়া কর্মসূচি হতে পারে এই সামাজিক আন্দোলন। 

কেপভার্দের মতো ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা লাভ করা ৪০৩৩ বর্গকিলোমিটারের, ৪৯১,২৩৩ জন জনসংখ্যার একটা ছোটো দ্বীপরাষ্ট্র যদি ফুটবলকে একটা প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে দ্যা গ্রটেস্ট শো অন আর্থে নিজেদের দেশ ও জাতির শক্তি ও স্বপ্নের জানান দিয়ে বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হতে পারে তাহলে ৭১ এ স্বাধীনতাপ্রাপ্ত, ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার ও সতেরো কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ কেনো সফল হতে পারবে না এ ধরনের নেতিবাচক চিন্তাটাই অমূলক। আমরাও পারবো। আমাদের সেই শক্তি ও সাহস আছে। দরকার শুধু সরকার ও জনগণের স্বপ্ন ও সদিচ্ছা। খেলাটাকে একটা অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা। খেলাটাকে কেন্দ্র করে এর বিকেন্দ্রীকরণ,সিন্ডিকেট ভাঙ্গণ ও বৈশ্বিক ক্রীড়া সংযোগটাকে বাড়ানো।

এই কর্মসূচিগুলো নিতে পারলে জাতি হিসেবে বাঙালি আর শুধু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর স্টাইল গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হবে না; বরং  তারা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোই হবে। এই স্বপ্নালু ও গৌরবময় সুসময়ের অপেক্ষায়...


লেখক: শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।