স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতার আদৌ প্রয়োজন আছে?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবকসহ যে বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োজিত তার সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি (প্রাথমিক ২.১০ কোটি, মাধ্যমিক ১.২০ কোটি, উচ্চমাধ্যমিক ৩০–৪০ লাখ, ডিগ্রি (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়য়) ২০–২৫ লাখ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫.৮ লাখ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৪.৫ লাখ, কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ১০.০ লখ) [ব্যানবেইস রিপোর্ট ২০২৩] ।
স্বাধীনতা অর্জনের বিগত ৫০ বছরে দেশে অন্তত ৯টি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে প্রতিটি সরকার কিছু না কিছু কাজ করেছে। কিন্তু শিক্ষা সংস্কারের কাজ কতটা সফল হয়েছে? গুণগত শিক্ষা প্রদানে আমরা কতটা সফলতা অর্জন করতে পেরেছি? শিক্ষায় অনুদান প্রদানকারী প্রথম সারির উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে পরিচিত বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফ –এর মূল্যায়নে দেখা যায় বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও শ্রীলংকার চেয়ে খারাপ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৫ম শ্রেণী পাশ একজন ছাত্র বিজ্ঞান, গণিত ও ভাষা বিষয়ে যা জানে–শ্রীলংকা কিংবা ভারতের ৩য় শ্রেণির ছাত্র ছাত্রীরা তার চেয়ে ভাল জানে। আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের যে পরাকাষ্ঠা তা আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেখেই অনুমান করতে পারি যেখানে শতকরা মাত্র ১০ জন পাশ করে ও ৯০ জন ফেল করে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় আজ অব্দি বৈশ্বিক ৫০০ উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নাম লেখাতে পারেনি। এই বৈশ্বিক র্যাংকিং এ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যলয় না আসতে পারাকে উচ্চশিক্ষার বিরাট ঘাটতি বলে অনেকে মনে করেন। যদিও দক্ষিণ এশীয় দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় উল্লিখিত বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং তালিকায় প্রতি বছর স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়।
উপর্যুক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিএনপি দীর্ঘ সতের বছর পর ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে সদ্য ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে অভিজ্ঞ ড এহসানুল হক মিলন শিক্ষামন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি গত ৯ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন। মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে তিনি বলেন,
‘শিক্ষার উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী ও সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। দেশের জনসংখ্যাগত সুবিধা তথা ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ড এবং ভবিষ্যতের লংজিভিটি ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সুস্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। বিএনপির শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হবে জীবনমুখী, কর্মমুখী ও উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে (বর্তমান ব্যয় জিডিপি’র মাত্র ১.৮৩%)। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করা, সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা, পর্যায়ক্রমে মিড-ডে মিল চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা, সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল এডু-আইডি চালুর বিষয়েও সভায় আলোচনা করা হয়। এছাড়া মাদ্রাসাশিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে আইটি, বিজ্ঞান ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। শিক্ষাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে এনে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও বাস্তব দক্ষতা উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণ করা হবে’ (ডেইলি ক্যাম্পাস, ১০ মার্চ ২০২৬)।
শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষাসংস্কার বিষয়ক এই বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সকলকে যারপর নাই অনুপ্রাণীত করেছে। শিক্ষা নিয়ে হতাশ ব্যক্তিদের মনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু এরই মধ্যে আর একটি সংবাদ সমভাবে সকলকে হতাশ ব্যথিত করেছে। সেটি হলো স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদে নিয়োগের জন্যে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন প্রয়োজন নেই এই মর্মে শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঘোষনা (ডেইলি ক্যাম্পাস, ১২ মার্চ ২০২৬) ।
২০২৪ সালের মে মাসের আগে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি হতে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হতো না। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের মে মাসে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ প্রণয়ন করে। ঐ প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগ্যতা বিষয়ে বলা হয়েছিল, এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ কোনো ব্যক্তি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।
এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট প্রবিধানমালা সংশোধন করে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস নির্ধারণ করে গেজেট জারি করে। সেই নিয়ম বাতিল করে ২০২৪ সালের আগের নিয়মে ফিরলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটির সভাপতি পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। অর্থাৎ এখন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি হতে হলে শিক্ষাগত কোন যোগ্যতা লাগবে না।
বিগত ১০ মার্চ, ২০২৬ দুপুরে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ রিভিউ সংক্রান্ত আলোচনা সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিগগির এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক।
তারা আরও জানান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগে সংসদ সদস্যের ক্ষমতাও আর থাকছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, ইউএনও, ডিসি, বিভাগীয় কমিশনার হয়ে শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানের কাছে তিনজনের নামের তালিকা যাবে। সেখান থেকে একজনকে কমিটির প্রধান বা সভাপতি করবে শিক্ষাবোর্ড।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্কুল প্রায় ১৮ হাজার, স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রায় দেড় হাজার, কলেজ ৩ হাজার ৩৪১টি, মাদরাসা (দাখিল-কামিল পর্যায়) ৯ হাজার ২৫৯টি এবং কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৩৯৫টি। এ সকল প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হয় ম্যানেজিং কমিটি অথবা গভর্ণিং বডির মাধ্যমে। ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ অনুযায়ী পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এই ম্যানেজিং কমিটি/গভর্ণিং বডির গঠন নিন্মরূপঃ
(ক) একজন সভাপতি।
(খ) মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, শিক্ষকের ভোটে নির্বাচিত ২ জন সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি। তবে শর্ত থাকে যে, মাধ্যমিক স্তরের কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক স্তর সংযুক্ত থাকলে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ভোটে একজন সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি এবং প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের ভোটে একজন সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন।
(গ) নিম্নমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, নিম্নমাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষকের ভোটে নির্বাচিত ২ জন সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি।
তবে শর্ত থাকে যে, নিম্নমাধ্যমিক স্তরের কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক স্তর সংযুক্ত থাকলে, নিম্নমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ভোটে একজন সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি এবং প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের ভোটে একজন সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন।
(ঘ) মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, মাধ্যমিক স্তরের কেবল মহিলা শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত একজন সংরক্ষিত মহিলা শিক্ষক প্রতিনিধি। তবে শর্ত থাকে যে, মাধ্যমিক স্তরের কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক স্তর সংযুক্ত থাকলে, মহিলা শিক্ষক প্রতিনিধি উভয় স্তরের মহিলা শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত হবেন।
(ঙ) নিম্নমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, নিম্নমাধ্যমিক স্তরের কেবল মহিলা শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত একজন সংরক্ষিত মহিলা শিক্ষক প্রতিনিধি থাকবে। ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ হবে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ২ বছর।
উক্ত প্রবিধানমালায় আরও বলা হয়েছে, এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ কোনো ব্যক্তি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।
কোনো শিক্ষক কর্মরত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না তবে, সমপর্যায়ের বা নিম্নস্তরের অন্য কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে সভাপতি পদে নির্বাচিত হতে বাধা নেই।
কোনো ব্যক্তি একই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে ২ বারের অধিক সভাপতি, শিক্ষক প্রতিনিধি বা অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারবেন না। তবে এক মেয়াদ বিরতি শেষে তিনি পুনরায় নির্বাচন করতে পারবেন।
কোনো ব্যক্তি ২টির অধিক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হতে পারবেন না এবং যেকোনো ধরনের ৪টির অধিক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
ম্যানেজিং কমিটি/গভর্ণিং বডির কাজ কী?
- স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা
- স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার বাজেট ও ব্যয় তদারকি করা
- স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও মানোন্নয়ন নজরদারি করা
- শিক্ষক এবং স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা
- অভিভাবক এবং স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার মধ্যে সেতু তৈরি করা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা কেন জরুরি
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণ হয় শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মাধ্যমে নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত থাকে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, নীতিনিষ্ঠতা এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষকেরা পাঠদান করেন, কিন্তু সেই শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে মূলত পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। শিক্ষকেরা কতটা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে কাজ করবেন, শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে পড়াশোনা করবে, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কতটা স্বচ্ছ থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশে নির্ভর করে পরিচালনা কমিটির ওপর।
বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি পরিচালনা কমিটির হাতে নেই। তবু শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, পদোন্নতি–সংক্রান্ত সুপারিশ, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ, পুরস্কার প্রদান কিংবা প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখনো পরিচালনা কমিটির অধীনেই রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়ভারও মূলত এই কমিটির ওপর বর্তায়। ফলে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের যোগ্যতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বোঝার জন্য একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত ভিত্তি প্রয়োজন। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে এসব বিষয় সঠিকভাবে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশের অধিকাংশ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষ। তাই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির জন্য স্নাতক ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা শিথিল বা বাতিল করার বিষয়ে সম্প্রতি যে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে চলছে, তা শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক শিক্ষাভাবনা যা উপরে বলা হয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক।
বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। শিক্ষা এখন আর শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, সৃজনশীলতা বিকাশ, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাচর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠন। নতুন কারিকুলাম, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য শুধু নীতিনির্ধারণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে সচেতন ও দক্ষ নেতৃত্ব।
সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিনির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু সেই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির ওপর। ফলে এই কমিটির নেতৃত্ব কতটা সৎ, শিক্ষিত, সচেতন ও দূরদর্শী, তা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড শিথিল করা হয়, তবে কিছু বাস্তব সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমন -
১। শিক্ষাব্যবস্থার কারিগরি দিকগুলো যথাযথ অনুধাবনে সমস্যা সৃষ্টি হয়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বোঝার জন্য একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত ভিত্তি প্রয়োজন। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে এসব বিষয় সঠিকভাবে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
২। শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বর্তমানে শিক্ষা খাতে নানা ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের সফল বাস্তবায়নের জন্য পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্ব যদি এসব বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না হয়, তবে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা বা তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৩। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অযৌক্তিকতা বা আবেগপ্রবণতা দেখা দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনেক সিদ্ধান্ত সূক্ষ্ম ও বিশ্লেষণনির্ভর। পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা না থাকলে অনেক সময় সিদ্ধান্তগুলো যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্থানীয় প্রভাব বা আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, এবং
৪। প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার ঝুঁকি বাড়ে। পরিচালনা কমিটি প্রতিষ্ঠানের অর্থব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই স্বেচ্ছাসেবী না হয়ে স্বেচ্ছাচারী ও স্বার্থবাদী হয়ে ওঠে। তাঁরা লাভজনক মনে করেই কমিটিতে থাকার জন্য মরিয়া হন! সৎ, দক্ষ, সুশিক্ষিত ও সচেতন নেতৃত্ব না থাকলে এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন সুযোগ আছে বলেই কমিটির পদ নেওয়ার এত প্রতিযোগিতা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাব বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়। তাঁরা অনেকেই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে থাকেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকলে এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায় এবং শিক্ষার পরিবেশ চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। এমন অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যেই রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তিরা নেতৃত্বে থাকেন, তখন শিক্ষকসমাজ অনেক সময় অস্বস্তি বোধ করেন এবং নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করেন।
অন্যদিকে পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে সৎ, শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিরা থাকলে সাধারণত একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়। তাঁরা শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকেন এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষিত নেতৃত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও তুলনামূলক সহজ হয়। আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে সচেতন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর সুশৃঙ্খল করতে পারে। ফলে শিক্ষকেরা পেশাগত মর্যাদা অনুভব করেন এবং শিক্ষার্থীরাও একটি স্বাস্থ্যকর শিক্ষা পরিবেশ পায়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া এবং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়া একই বিষয় নয়। প্রথমটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়, দ্বিতীয়টি মূলত প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে একটি প্রজন্মের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপর। তাই এ ধরনের দায়িত্বে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি সেই নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
তাই পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড বজায় রাখা কেবল প্রশাসনিক শর্ত নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আর সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি দুর্বল হয়, তবে শক্ত ভিত্তির ওপর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের সততা, ভদ্রতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, দূরদর্শিতা এবং উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যাবশ্যক।
আমাদের মানব সমাজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটাই প্রধানতম উদ্দেশ্য জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। এজন্য প্রয়োজন যথোপযুক্ত ও আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানব সমাজকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রকৃত দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যে প্রতিষ্ঠান হবে সমাজ ও জাতির অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অপসংস্কৃতি, অন্যায্যতা, অনধিকার, অনগ্রসরতার ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে শিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে অত্যুজ্জ্বল প্রভার জ্যোতি বিচ্ছুরণ করা এবং ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড-’ হিসেবে সমাজকে তার প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে জাতিকে উন্নয়নের শিখরে প্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। আর এই আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চালিকা শক্তিই হচ্ছেন আদর্শ শিক্ষক। আদর্শ শিক্ষকই জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারেন। এই আদর্শ মানব সমাজ গড়ার ব্রত নিয়ে আমাদের দেশে আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার স্মরণ নিয়ে জাতির মেরুদন্ড গড়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।
আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরন দুই প্রকার। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার প্রধানতম উদ্দেশ্য ও আদর্শ একই, জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা (শিক্ষা বাতায়ন) ।
শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষিত মানুষই পারে সমাজের অত্যাচার, অনাচার দুর করতে। আর শিক্ষিত মানুষ তৈরির কারখানা অর্থাৎ স্কুল-কলেজের স্বাভাবিক গতি অব্যাহত রাখতে এবং শিক্ষিত সমাজ বির্নিমাণে স্কুল-কলেজের জন্য অত্যাবশ্যক হলো শক্তিশালী, কর্মতৎপর, শিক্ষিত মানুষদের নিয়ে গঠিত ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজিং কমিটি।
আমরা যদি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকাই তবে গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ স্কুলেই স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের অসংখ্য প্রমাণ আমরা পাই। ম্যানেজিং কমিটি সঠিক ও দিকনির্দেশনা মূলক পরামর্শ দিয়ে শিক্ষার মান দ্রুত ঊর্ধ্বমুখি করার চেষ্টা করবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অংশ নেবে এটিই হওয়া বাঞ্চনীয়। কিন্তু সরকারের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নীতিমালায় কমিটির সদস্য হতে কতটুকু শিক্ষিত হতে হবে তা উল্লেখ নেই। এ সুযোগে গ্রামের প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক দলের নেতারাই (যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকেন সেই সরকার দলের নেতারা) সম্মানের জন্য বাগিয়ে বসেন ম্যানেজিং কমিটির পদ-পদবী। কোন কোন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির দেখভাল তো দুরের কথা মাসিক সভায়ও সদস্যদের খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কমিটির পদ-পদবী বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষকদের উপর ছড়ি ঘুরাতে অনেকে সিদ্ধহস্ত। অনেক সময় নিজেদের পছন্দের মতামত শিক্ষকদের উপর জোড় করে চাপিয়ে দেন। এ অবস্থায় শিক্ষকরা ‘না পারি কইতে, না পারি সইতে’ অবস্থায় নিপতিত হন। তাই
- ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে অবশ্যই দুরদৃষ্টি সম্পন্ন, কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রি পাশ, বয়স চল্লিশোর্ধ এবং সমাজ সচেতন, দেশপ্রেমিক ব্যক্তি হতে হবে;
- কমিটির অন্যান্য সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে কমপক্ষে এসএসসি পাশ;
- ম্যানেজিং কমিটিতে যারা অন্তর্ভূক্ত হবেন তাদের হতে হবে সৎ, নির্ভিক ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য;
- ম্যানেজিং কমিটির সদস্য যারা হবেন তারা যে কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শের অনুসারী হতে পারেন তবে জনপ্রতিনিধি (সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানদ্বয়, পৌর মেয়র, কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, মেম্বার ইত্যাদি) ছাড়া কোন রাজনৈতিক দলের পদবীধারী কেউ ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হতে পারবেন না।
- কোন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, মামলার চার্জশীটভূক্ত, মামলার এজহারভূক্ত কেউ ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হতে পারবেন না। কেউ যদি সদস্য হিসেবে ইতোপূর্বে অন্তর্ভূক্ত হবার পর কোন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, মামলার চার্জশীটভূক্ত, মামলার এজহারভূক্ত হন তবে তাৎক্ষণিক তার পদ শুন্য ঘোষণা করতে হবে।
সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় উপর্যুক্ত প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনায় আনলে বাংলাদেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার মান দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসবে এবং দেশ উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় গতি বৃদ্ধি পাবে।
আমরা আশা করবো, বর্তমান বিএনপি সরকার শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি তথা এস ডি জি’র লক্ষ্যমাত্রা ৪ পরিপূরণের স্বার্থে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করবেন এবং শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখবেন।
লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি
ইমেইল: amatin@aub.ac.bd