০৩ মার্চ ২০২৬, ১৭:৩৯

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: বাংলাদেশিদের আবেগ বনাম বাস্তবতা

মো. ফিরোজ আলম  © টিডিসি সম্পাদিত

ইরান বনাম ইসরাইল-আমেরিকার মধ্যে কয়েক বছর ধরে যুদ্ধের পূর্বাভাস দেখা গেলেও পারমাণবিক ইস্যু কেন্দ্র করে বাস্তবিক যুদ্ধ শুরু হয়। বাংলাদেশ থেকে ইদানিং একাধিক গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে সংগঠিত যুদ্ধে ইরানের পক্ষে মুসলিম বিশ্বের আজাদী ইসলামের নেতৃত্ব দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এতক্ষণে আমেরিকান অ্যাম্বাসির সামনে সাধারণ জনতার নামে মব সৃষ্টি করতে না গেলেও কঠোর কর্মসূচির হুংকার দিয়েছেন। যারা মগজে এই জাতীয় উদ্ভাট চিন্তা নিয়ে অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি করেন, তাদের অন্তত জানা দরকার ইরানে প্রায় ২০০০ বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছে।

অন্যদিকে আমেরিকায় প্রায় ৩,৫০,০০০; মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবে আছে ৪০,০০০০০(+); সংযুক্ত আরব-আমিরাতে ১৬,০০০০০(+/-); বাহরাইনে ১,৫০,০০০; ওমানে ৭০০০০০; কাতারে ৫০০০০০; কুয়েতে ৪,৫০,০০০— সব মিলিয়ে সংখ্যায় দাঁড়ায় ৭৭ লাখ ৫০ হাজার। যাদের অধিকাংশই শ্রমিক, ব্যবসায়ী অথবা স্টুডেন্ট। 

এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঐসব দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরা যদি বাংলাদেশে সংগঠিত উসকানিমূলক প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়লেও বিপদ্‌গ্রস্ত হতে পারে। 

যুদ্ধ পরবর্তীতে দেশদ্রোহীতার অভিযোগে, সেসব দেশের বিদ্যমান আইনে অথবা নতুন আইন প্রণয়ন করে প্রবাসী অভিযুক্তদের বিচার করে কিংবা দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিলে তাদের নিজেদের এবং পরিবারের যেমন ক্ষতি হবে তেমনি দেশের অর্থনীতির উপরও চাপ পড়বে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও শঙ্কার বিষয় হলো এসব দেশে ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের জন্য প্রবেশ সংকীর্ণ হয়ে যেতে পারে। 

আমাদের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত পোশাক শিল্প। এসব দেশেই আমরা হাজার কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছি, মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। পরবর্তীতে যদি এরা বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি বন্ধ করে দেয় তবে এই পোশাক শিল্পের ক্রেতা কিংবা বিকল্প বাজার কী হবে? যদি আমাদের বিকল্প বাজার না থাকে তাহলে এই শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। তখন অর্থনীতির চাকা সচল রাখবো কীভাবে? পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কী?  

আবেগে বলা যায়, আমাদের দেশে কম মজুরি এবং মূল্যে পাওয়া যায় তাই, তারাই আমাদের উপর নির্ভরশীল। আশির দশকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে এই পোশাক শিল্প এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বে বাংলাদেশ ছাড়াই ঐসব দেশগুলো চলতে সক্ষম ছিলো নিশ্চয়ই। ভবিষ্যতে তাদের প্রয়োজন মেটানো একেবারেই অসম্ভব নয়। বাংলাদেশ যদি ভুল পথে ধাবিত হয় এশিয়ার অন্যান্য দেশ কিংবা আফ্রিকার জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির এটি সুযোগও হতে পারে। 

এসব যুক্তিযুক্ত বাস্তবতা বাদ দিয়ে ধার্মিকতার নামে উগ্রবাদী গোষ্ঠী ধর্মান্ধ/অজ্ঞ হয় তাদের জানা উচিত পবিত্র কুরআন শরীফে বর্ণিত আছে- “কেউ যদি হত্যা অথবা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া কাউকে হত্যা করে, তবে সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল। —সূরা মায়েদা (০৫) : ৩২”। 

এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বোমা হামলায় এখন পর্যন্ত তিনজন বাংলাদেশি শহীদ হয়েছেন। তারা কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধে যায়নি। সাধারণ মানুষ হিসেবেই অতর্কিত হামলায় তারা শহীদ হলেন। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যে সব দেশে ইরান হামলা করেছে সেইসব দেশ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামিক রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে খুবই হিসেব-নিকেশ করে বাস্তবতার নিরিখে পথ চলতে হবে। যুদ্ধ নয়, আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়াটাই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক।

লেখক: সাবেক গণসংযোগ সম্পাদক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ ও এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়