০৩ মার্চ ২০২৬, ১৪:২৭

রোজাদারকেও প্রতিনিয়ত কয়েকটি উপাদান গ্রহণ করতে হয়, উপলব্ধি করেন কয়জন

রোজাদারকেও প্রতিনিয়ত কয়েকটি উপাদান গ্রহণ করতে হয়, উপলব্ধি করেন কয়জন  © সংগৃহীত

সিয়াম বা রোজা এক গভীর উপলব্ধি ও সচেতনতার অনুশীলন। সিয়াম আমাদের শেখায় পানি ও খাবার ছাড়াও দীর্ঘ সময় বেশ স্বস্তির সঙ্গে প্রতিদিনকার কাজ ও দায়িত্ব সামাল দেয়া যায়। তবে পরোক্ষভাবে উপলব্ধি করতে শেখায় যে বেঁচে থাকার কয়েকটি মৌলিক উপাদান-অক্সিজেন, উত্তাপ, মাধ্যাকর্ষণ- রোজাদারকেও প্রতিনিয়ত গ্রহণ করতে হয়। এসবের ওপরই আমাদের অস্তিত্ব, জীবন-ধারণ নির্ভর করছে।

রোজাদার দিনের বেলায় পানি ও খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু তিনি কি সবকিছু থেকে বিরত থাকেন? না। গভীর বিষয়টি হলো অক্সিজেন, উত্তাপ, মাধ্যাকর্ষণ- এসব গ্রহণে কোনো বিধিনিষেধ নেই; বরং এগুলো ছাড়া রোজা তো দূরের কথা, বেঁচে থাকাই অসম্ভব।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতি মিনিটে গড়ে ১২-২০ বার শ্বাস নেয়। প্রতি নিঃশ্বাসে প্রায় আধা লিটার বাতাস গ্রহণ করে তার ফুসফুস। সেই হিসাব অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় আনুমানিক ৮ থেকে ১১ হাজার লিটার বাতাস টেনে নেয় ফুসফুস। বাতাসে ২১ শতাংশ অক্সিজেন থাকলেও শরীর ব্যবহার করে মাত্র ৪-৫ শতাংশ। ফলে দৈনিক প্রায় ৪০০-৬০০ লিটার বিশুদ্ধ অক্সিজেন আমাদের শরীর সচল রাখতে প্রয়োজন হয়। রোজাদারও এই জৈবিক প্রয়োজনের বাইরে নন।

সাধারণত অক্সিজেন ছাড়া ৫–১০ সেকেন্ডের মধ্যে মানুষ সংজ্ঞা হারাতে পারে, ৪-৬ মিনিটে মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি শুরু হয়। এবং মাত্র ৮ মিনিট অক্সিজেন-শূন্য অবস্থায় থাকলে ব্রেন-ডেথ হতে পারে। অথচ খাবার ছাড়া মানুষ এক মাসেরও বেশি সময় টিকে থাকতে পারে, পানি ছাড়া সপ্তাহ খানিক। তাহলে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আজিজ নামের এক রোজাদার বলেন, ‘মানুষ প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার বাতাস নেয়, কিন্তু কয়বার ভাবেন- যে অক্সিজেন না থাকলে তিনি ১০ মিনিটও বাঁচবে না। রোজা থাকাকালীন আমরা কয়জন এমনটি উপলব্ধি করি।’

যদি বাজারদরে হিসাব করি-তাহলে প্রক্রিয়াজাত ৫০০ লিটার অক্সিজেনের অর্থমূল্য প্রায় লাখ টাকা হতে পারে। একজন রোজাদারের সেহরি ও ইফতারের বাজারমূল্য আনুমানিক ৫০০-১০০০ টাকা হলেও রোজারত অবস্থায় আনুমানিক ১২-১৫ ঘণ্টায় তিনি অর্ধলাখ টাকার অক্সিজেন সেবন করে থাকেন। এখানে একটি বিষয় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, মেডিক্যাল অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন কখনই প্রস্তুত করে না, তারা শুধুমাত্র বাতাস থেকে অক্সিজেনকে আলাদা করেন। এই পৃথিবীতে অক্সিজেন উৎপাদন করে শুধুমাত্র সামুদ্রিক শৈবাল ও গাছপালা।

জালালুদ্দিন আসরার চৌধুরী নামের আরেক রোজাদার বলেন, ‘একমাত্র ইবাদত রোজা আমাদের উপলব্ধি করতে শেখায়- খাবার ও পানি ছাড়লেও সেই সময় জীবনীশক্তি বিসর্জন করতে হয় না। বরং তখনও আমরা মহান সৃষ্টিকর্তার দেয়া অমূল্য নেয়ামত বিশুদ্ধ বাতাসের মধ্যে ডুবে থাকি। মাছ যেমন পানি ছাড়া কিছুক্ষণ বাঁচতে পারে তেমনটি মানুষও বাতাস ছাড়া কয়েক মুহূর্ত টিকে থাকতে পারে।’ 

মাপা অনুগ্রহ উত্তাপ ও তাপমাত্রা: পৃথিবীর তাপমাত্রা সামান্য কম হলে বরফে ঢাকা পড়তো বহু অঞ্চল, সামান্য বেশি হলে পরিবেশ ও প্রাণ পুড়ে যেত। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর দূরত্ব, বায়ুমণ্ডলের গঠন- সবকিছু এমনভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে কারণে জীবনধারণ সম্ভবপর হচ্ছে। শীতে রোজা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। দিন ছোট, তাপ কম। কিন্তু গ্রীষ্মে দীর্ঘতম দিন, প্রচণ্ড উত্তাপ- বিশেষ করে শ্রমজীবীদের জন্য রোজা এক বিশাল ধৈর্যের পরীক্ষা। এখানেও বোঝা যায়- তাপমাত্রা কেবল আবহাওয়া নয়, এটি জীবনযাত্রার গভীর নিয়ামক।

নীরব ভিত্তি মাধ্যাকর্ষণ: আমরা কাজ করি, হাঁটি, বসি, ঘুমাই। তবে হয়ত কখনই ভাবি না কেন আমরা ভেসে যাচ্ছি না। মানবসভ্যতা শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় কয়েক লাখ বছর মাধ্যাকর্ষণের ভেতরেই অস্তিত্বশীল থেকেছে, কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আসে অনেক পরে। ১৭শ শতকে আইজ্যাক নিউটন সর্বপ্রথম মহাকর্ষ সূত্র ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ সভ্যতা মাধ্যাকর্ষণের ওপর অস্তিত্বশীল থেকেও এর গুরুত্ব আলাদাভাবে অনুধাবন করতে কয়েক লাখ বছর লেগে গেছে।

নভোচারীরা যখন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মিশনে মহাশূন্যে যান, তখন তারা ‘ওভারভিউ ইফেক্ট’-এর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। একজন নভোচারীর ভাষায়, ‘পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতাই আসলে এক অলৌকিক স্থিতি। মহাশূন্যে মাধ্যাকর্ষণ ছাড়া পানি গ্লাসে থাকে না, মানুষ সহজে হাঁটতে পারে না।’

রোজাদার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সৃষ্টিকর্তাকে সিজদা করে- কিন্তু তিনি কি ভাবেন, তাকে নিচে টেনে রাখছে যে অদৃশ্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, সেটিও এক অতিগুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত?

পবিত্র কুরআনে ‘সময়’-এর শপথ নিয়ে বলা হয়েছে মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। সেই সময়ের কোনো বাজারমূল্য নেই। অথচ সব বাজার দাঁড়িয়ে রয়েছে সময়ের ওপর।

দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার তার ‘বিইং অ্যান্ড টাইম’ বইয়ে লিখেছেন- মানুষ সময়ের মধ্যে নিক্ষিপ্ত এক সত্তা। আমরা সময় ব্যবহার করি, ভাবনা-চিন্তা করি, কিন্তু সেই সময়কাল বা যুগই আমাদের গড়ে তোলে। রোজা আমাদেরকে সময়-এর ভেতর সচেতন করে, ক্ষুধার প্রতিটি মুহূর্ত চলমান সময়কে অনুধাবন ও স্পষ্ট করে তোলে।

ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থায় আমরা পণ্যসহ সবকিছুর মূল্য নির্ধারণ করি এভাবে-যার দাম আছে তা মূল্যবান, যার দাম নেই তা তুচ্ছ এবং আলোচনার বিষয় নয়। বর্তমান ব্যবস্থায় অক্সিজেন, সূর্যের আলো, মাধ্যাকর্ষণ, সময়-এগুলো নিয়ে কোনো বিজ্ঞাপণ, বিলবোর্ড, টকশো, রিয়েলিটি শো নেই বললেই চলে। কারণ এসবের কোনো বাজারদর নেই। অথচ এগুলো ছাড়া জীবনই থমকে যাবে।

মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক গাজ্জালী (রহঃ) রোজাকে শুধু ক্ষুধা অনুধাবন নয়, হৃদয়ের জাগরণ বলেছেন। সুফি কবি জালালুদ্দিন রুমি বলেন, ‘প্রতিটি শ্বাসে তুমি জন্ম নিচ্ছো, প্রতিটি শ্বাসে তুমি ফিরেও যাচ্ছো।’ সুফি পরিভাষায় আছে- ‘হুশ দার দম’- প্রতিটি শ্বাসে সচেতনতা।

ব্যবসায়ী আসরার চৌধুরী আরও বলেন, ‘মানুষ তখনই কৃতজ্ঞ হয়, যখন হারানোর ভয় আসে। রোজা সেই ভয় ছাড়াই কৃতজ্ঞতা শেখানোর অনুশীলন। রোজা তাই শুধু ক্ষুধা নিয়ে সংযম নয়; এটি অস্তিত্বের জাগরণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আমরা খেয়ে বাঁচি না, আমরা শ্বাস নিয়ে বাঁচি। আর প্রতিটি শ্বাসই বিনামূল্যে পাই।’

রোজা আমাদের অনুধাবন করতে শেখায়- আমরা যে উপাদানগুলো ছাড়া বাঁচতে পারি না, সেগুলোই আমরা সবচেয়ে কম উপলব্ধি করি। কোথায় সবচেয়ে দুর্দান্ত সেহরি হ্যাঙ্ক আউট হয়, কারা সবচেয়ে আর্কষণীয় ইফতারের পশরা সাজিয়েছেন- তা নিয়ে রমজানে আমাদের আলোচনার শেষ নেই। কিন্তু আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে ভাবি না। আমরা বেশি বেতনের চাকরি, অল্প কষ্টে বেশি মুনাফা নিয়ে ফন্দি আঁটি, রিলস বানিয়ে ডলার কামানোতে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু অতিমূল্যবান বাতাস, উত্তাপ, ও সময় নিয়ে কথা বলি খুবই কম। আর এ কারণেই পবিত্র কুরআনে ‘সময়’-এর শপথ নিয়ে বলা হয়েছে- নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে ডুবে আছে।

লেখক: সাংবাদিক