০১ মার্চ ২০২৬, ২১:৩৩

বিপন্ন মানবতা ও বিধ্বংসী যুদ্ধ

প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম  © টিডিসি সম্পাদিত

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে মানব সভ্যতা তার ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছে। ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ২০২৬ সালের শুরুতে এসে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিধ্বংসী যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যা কেবল একটি অঞ্চলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং মানবিক মূল্যবোধকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা প্রমাণ করে যে, আধুনিক মারণাস্ত্রের যুগে যুদ্ধের পরিণাম কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সমগ্র মানবতার পরাজয় ডেকে আনে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের বৈরিতা দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসলেও, ২০২৪ সাল থেকে এই উত্তেজনা এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা লাভ করে। পূর্বে যে সংঘাত মূলত ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ারের (proxy war) মাধ্যমে পরিচালিত হতো, তা ২০২৫ সালের জুন মাসে "১২ দিনের যুদ্ধ" (12 Days of War) নামক সরাসরি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতে রূপ নেয়। এই সংঘাতের মূলে ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ। ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল মোসাদের সাথে সমন্বয় করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে একটি বিশাল বিমান হামলা পরিচালনা করে, যেখানে প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। এই হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) প্রধান হোসেন সালামি এবং সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ মোহাম্মদ বাঘেরি সহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন। ইরান এই হামলার জবাবে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন নিক্ষেপ করে, যার ফলে তেল আবিবের কিরিয়া অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের একার পক্ষে ইরানের সুসংগঠিত এবং ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা অসম্ভব হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

২০২৫ সালের ২২ জুন মার্কিন বিমান বাহিনী তাদের বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান এবং জিবিইউ-৫৭ (GBU-57 A/B) "বাঙ্কার বাস্টার" বোমা ব্যবহার করে ইরানের মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত ফোরদো (Fordow) পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে। ২৪ জুন একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই সংঘাত পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর একটি চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী আক্রমণ শুরু করে। এই অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে নির্মূল করা এবং ইরানে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা। এই আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী নিহত হন, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়। যুদ্ধের এই রূপটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত "ওয়ার অফ চয়েস" বা ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ, যা আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত হয়েছে। এই যুদ্ধের একটি বিশেষ দিক হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি ইরানি জনগণের প্রতি অভ্যুত্থানের আহ্বান জানানো। তিনি এই আক্রমণকে ইরানি জনগণের জন্য "প্রজন্মের একমাত্র সুযোগ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন; সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু ইরানিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করে, যার ফলে পাকিস্তানে মার্কিন কনসুলেটে বিক্ষোভকারীরা হামলা চালায় এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন স্বার্থের ওপর আঘাত আসার সম্ভাবনা তীব্র হয়। বিশ্লেষকদের মতে, আকাশপথের হামলা দিয়ে শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন এবং এর ফলে একটি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

যুদ্ধের ইতিহাস আসলে মানব সভ্যতার ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিরই এক ধারাবাহিক আখ্যান। বিশ শতকের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যুদ্ধের যে বিবর্তন ঘটেছে, তা সভ্যতার অস্তিত্বকে বারবার হুমকির মুখে ফেলেছে। ১৯০০ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত যুদ্ধে প্রায় ১৮ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যদিও প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। ১৮০০ সালের পর থেকে যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে মৃত্যুবরণকারী সৈন্যের সংখ্যাই প্রায় ৩ কোটি ৭০ লক্ষ। এই বিশাল মৃত্যুমিছিলের ৯০ শতাংশই ঘটেছে মাত্র ১০টি বড় মাপের যুদ্ধে, যার মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে কার্ল ফন ক্লজউইৎজের (Carl von Clausewitz) যুদ্ধতত্ত্ব অনুযায়ী যুদ্ধ ছিল "জাতীয় নীতির একটি যৌক্তিক ও সীমিত হাতিয়ার।"  কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সময় থেকে যুদ্ধের এই চরিত্র পরিবর্তিত হয়ে "টোটাল ওয়ার" বা সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নেয়। এই যুদ্ধগুলোতে কেবল সামরিক বাহিনী নয়, বরং সমগ্র জনসংখ্যা ও অর্থনীতিকে যুদ্ধের সম্পদে পরিণত করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৭ কোটিরও বেশি সৈন্য এবং দ্বিতীয় বিশ্বচিত্রে ২১ কোটির বেশি সৈন্য প্রাণ হারায়। এই যুদ্ধগুলো সাম্রাজ্যের পতন ঘটায় এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান ঘটায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান যুদ্ধকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।

১৯৫৩ সালে মার্কিন সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ (MI6) কর্তৃক ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা ছিল এই বৈরিতার প্রথম বীজ। মোসাদ্দেক ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন, যা পশ্চিমা স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। এরপর ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট এই সম্পর্ককে স্থায়ী শত্রুতায় রূপান্তর করে। ২০২৬ সালের যুদ্ধটি মূলত সেই ৫৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে যুদ্ধের কৌশলও আধুনিক হয়েছে। ১৯১৪ সালে যেখানে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও তা প্রয়োগ করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের যুদ্ধে বাঙ্কার বাস্টার এবং প্রিসিশন-গাইডেড মিউনিশন (PGM) ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানার ক্ষমতা অর্জন করেছে সামরিক বাহিনীগুলো। তবে প্রযুক্তিগত এই অগ্রগতি বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। আধুনিক যুদ্ধগুলো এখন শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, যার ফলে গাজা বা সুদানের মতো সংঘাতে ৯- শতাংশ হতাহত হচ্ছে বেসামরিক মানুষ।

একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে যুদ্ধ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বা অর্থনৈতিক গতিশীলতা তৈরি করে, কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে মানব সভ্যতার মৌলিক এবং টেকসই অগ্রগতিগুলো সব সময় শান্তি ও সহযোগিতার মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফাংশনালিজম (Functionalism) যুদ্ধকে সামাজিক সংহতি বৃদ্ধির একটি মাধ্যম হিসেবে দেখলেও, কনফ্লিক্ট থিওরি (Conflict Theory) যুদ্ধকে কেবল উচ্চবিত্ত বা "পাওয়ার এলিট"দের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে। সভ্যতার ইতিহাসে শান্তির প্রভাব বোঝার জন্য ইসলামি স্বর্ণযুগ (Islamic Golden Age) একটি অনন্য উদাহরণ।

অষ্টম থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত এই কালখণ্ডে মুসলিম বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছিল, তা সম্ভব হয়েছিল একটি স্থিতিশীল এবং মুক্ত চিন্তার পরিবেশের কারণে। এই সময়ে বাগদাদের "বায়তুল হিকমাহ" (House of Wisdom) গ্রিক, ভারতীয় এবং চীনা পাণ্ডুলিপিগুলো অনুবাদ করে জ্ঞান সংরক্ষণের এক বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই অগ্রগতি কোনো সামরিক বিজয়ের ফল ছিল না, বরং এটি ছিল ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সহযোগিতার ফল। এই অর্জনগুলো প্রমাণ করে যে, যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ সামরিক খাতে ব্যয়ের পরিবর্তে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হয়, তখনই সভ্যতা তার শিখরে পৌঁছায়। যুদ্ধের ফলে অর্জিত "অগ্রগতি" যেমন—ইন্টারনেট বা রকেট প্রযুক্তি—আসলে ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্য থেকে তৈরি হয়েছিল যা পরবর্তীতে শান্তির কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু সরাসরি শান্তির উদ্দেশ্যে পরিচালিত গবেষণাগুলো মানবতাকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে। সভ্যতার বিবর্তনে দেখা যায়, যখনই কোনো জাতি যুদ্ধের উন্মাদনায় মেতেছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে তাদের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলেছে। পক্ষান্তরে, প্যাক্স রোমানা (Pax Romana) বা ইসলামি স্বর্ণযুগের মতো দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সময়গুলোই মানবজাতির জন্য সবচেয়ে সৃজনশীল সময় হিসেবে গণ্য হয়।

২০২৬ সালের সংঘাত এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের বর্তমান রূপটি বিবেচনা করলে এটি স্পষ্ট যে, যুদ্ধ বন্ধ করা এখন কেবল একটি নৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং মানবজাতির টিকে থাকার জন্য একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। আধুনিক মারণাস্ত্র এবং পারমাণবিক সক্ষমতার বিস্তার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ সমগ্র গ্রহকে ধ্বংস করে দিতে পারে। যুদ্ধ কেবল মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না, এটি পরিবেশ ধ্বংস করে, মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেয়। 

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল "পরবর্তী প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা।" কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান সংকট প্রমাণ করেছে যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে অসহায়। ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নির্বাচনী বহুপাক্ষিকতা (selective multilateralism) আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তিগুলো যখন তাদের কৌশলগত স্বার্থের সাথে মিলে যায় তখনই কেবল আন্তর্জাতিক আইনকে বৈধতা প্রদানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, অন্যথায় তারা তা লঙ্ঘন করতে দ্বিধা করে না। বর্তমান যুদ্ধগুলোতে হতাহতদের ৯০ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক।

২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ২৪ কোটি মানুষের মানবিক সাহায্যের প্রয়োজন হবে। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়, যা দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জরুরি সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যবহার করা সম্ভব। যুদ্ধ ও বোমাবর্ষণ মাটির উর্বরতা নষ্ট করে, পানি দূষিত করে এবং জলবায়ু সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। যুদ্ধ কেবল ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রায় ৬৭ কোটি নারী এবং ৫২ কোটি শিশু যুদ্ধবিধ্বস্ত বা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের আশেপাশে বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law - IHL) যুদ্ধকে সীমিত করার চেষ্টা করলেও, এটি যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানোর ক্ষেত্রে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে আসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার (asymmetric warfare) এবং ড্রোন হামলার ব্যাপকতা আইনি ফ্রেমওয়ার্কগুলোকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। তাই কেবল যুদ্ধকে "মানবিক" করার চেষ্টা না করে, যুদ্ধকে পুরোপুরি পরিহার করার দিকেই বিশ্বকে এগোতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, ওই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের যুদ্ধ সরাসরি এ দেশের প্রতিটি ঘরে আঘাত হানে। বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ কেবল একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়, বরং এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সংকেত। এই প্রভাব মূলত তিনটি প্রধান চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৌঁছায়: প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি খরচ। বাংলাদেশি শ্রমশক্তির একটি বিশাল অংশ—প্রায় ৭০ শতাংশ বা ১ কোটি ৫ লক্ষ মানুষ—মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। ২০২৬ সালের যুদ্ধে ইরান এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে নতুন করে শ্রমিকদের সেখানে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি, যারা সেখানে কাজ করছেন তারা রয়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছিল যে, ইরাক ও কুয়েত থেকে ৭৮,০০০ বাংলাদেশি শ্রমিক সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে লেবানন বা অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চল থেকে ইতিমধ্যে শ্রমিকরা ফিরতে শুরু করেছেন। যারা সেখানে আটকা পড়েছেন, তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো রেমিট্যান্স। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছিল, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল রেখেছিল। এই আয়ের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশই আসে জিসিসি (GCC) দেশগুলো থেকে। যুদ্ধের কারণে এই দেশগুলোর অর্থনীতি যদি শ্লথ হয়ে পড়ে, তবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হবে অথবা তাদের বেতন কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে যে, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করে; এই আয়ে টান পড়লে দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz), যা দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ এলএনজি এবং বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়, তা যুদ্ধের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শিপিং বিমা প্রিমিয়াম ইতিমধ্যে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানি করা পণ্যের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প, যা দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়, এই পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারাচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ১০.১৩ শতাংশ; ২০২৬ সালের যুদ্ধ এই হারকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।

২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং এর সামগ্রিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রভাব বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, আধুনিক যুদ্ধ কোনো বিজয়ী পক্ষ তৈরি করে না, বরং এটি মানবজাতির জন্য একটি "লুজ-লুজ" গেম বা উভয় পক্ষের পরাজয়ের পরিস্থিতি তৈরি করে। আমেরিকার ইরান আক্রমণ কেবল একটি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নয়, এটি সমগ্র বিশ্বের শ্রমবাজার, জ্বালানি সরবরাহ এবং মানবিক স্থিতিশীলতার ওপর একটি চপেটাঘাত। সভ্যতার ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতির প্রকৃত বিকাশ কেবল শান্তির সুশীতল ছায়াতেই সম্ভব। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই যুদ্ধ একটি অশনি সংকেত। প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল এই জাতি যুদ্ধের কারণে এক দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল এই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা এবং অভ্যন্তরীণভাবে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একই সাথে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে যাতে বৃহৎ শক্তিগুলো যুদ্ধের পথে না হেঁটে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে।

পরিশেষে বলতে হয়, বিপন্ন মানবতাকে রক্ষা করতে হলে যুদ্ধের ডামাডোল থামাতেই হবে। আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগে একটি ভুল সিদ্ধান্ত কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সমগ্র মানব সভ্যতাকে বিলুপ্তির পথে নিয়ে যেতে পারে। শান্তির মধ্য দিয়ে অর্জিত ইসলামি স্বর্ণযুগের সমৃদ্ধি বা বিশ শতকের পরবর্তী পঁয়তাল্লিশ বছরের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা প্রমাণ করে যে মানুষ যদি চায়, তবে সে যুদ্ধের পরিবর্তে সহযোগিতার পৃথিবী গড়তে পারে। ২০২৬ সালের এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বনেতাদের উচিত জাতিসংঘের সংস্কার করা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে আরও শক্তিশালী ও বৈষম্যহীন করা। কারণ যুদ্ধ কেবল ধ্বংস ডেকে আনে, আর শান্তিই হচ্ছে সভ্যতার একমাত্র এবং টেকসই চালিকাশক্তি।

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়