মাদক নিয়ন্ত্রণ নাকি নির্মূলের অভিযান বনাম বাস্তবতা
শিশু-কিশোর, স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত এবং তরুণ প্রজন্মকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়তে পরিবার সবচেয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। কোনো অবিভাবকই চান না পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত, বিপথগামী হোক। তরুণরা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, বার্থডে পার্টিসহ বিভিন্ন পার্টি, গ্রুপ স্টাডিসহ বিভিন্ন কারণে অভিভাবকদের থেকে অনুমতি নিয়েই অনেক সময় রাজধানীর বিভিন্ন পার্কসহ নানান জায়গায় একত্রিত হয়ে নিজেদের মতো সময় কাটান। কখনো কখনো অভিভাবকদের ভুল তথ্য দিয়ে, বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে, পরিবারের চক্ষু ফাঁকি দিয়ে বাহিরে সময় কাটান। এসব আড্ডায় একান্ত সময়ে নিজেদের মনোবিকাশ হয় আবার কেউবা কৌতূহল বসত মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ে। কখনো কখনো মানুষিক চাপ কিংবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে চাপমুক্ত মুক্ত হতে অন্যের প্ররোচনায় পরে বিপথগামী হয়ে থাকে, মাদক গ্রহণ করে থাকে।
মাদক সরবরাহকারী, বিক্রেতা এবং মাদকাসক্তদের যৌনউত্তেজক বৃদ্ধির গালগল্প, প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে কেউবা খেলাচ্ছলে মাদক গ্রহণ করে থাকেন। এভাবেই কৌতূহল বসত একদিন দুইদিন করে পর্যায়ক্রমে হয়ে মাদকাসক্ত পড়েন। এই আসক্তি থেকে অনেকেরই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা হয় না। যে অভিভাবকরা শুরুতে সন্তানদের মতিগতি দেখে বুঝতে পারেন তাদের সন্তান বিপথগামী হচ্ছে, তারা সুপথে ফিরিয়ে আনতে কিংবা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরিপূর্ণ রূপে মাদকাসক্ত হলে অভিভাবকরা তাদের নিয়ন্ত্রণ কিংবা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন। লোকলজ্জা কিংবা সামাজিক সুনাম নষ্ট হওয়ার ভয়ে অন্যের সাথে শেয়ার করতেও পারেন না। বিশেষ করে সমাজের প্রতিষ্ঠিত এবং অভিজাত শ্রেণির মানুষদের এক দুঃসহ মানবিক যন্ত্রণা গোপনে বয়ে বেড়াতে হয়।
স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন পরিবেশে প্রবেশ করেন। মূল শহরের বাইরে থেকে আসা অধিকাংশই ক্যাম্পাসের হলে কিংবা সহপাঠীরা একত্রিত হয়ে বাসা নিয়ে থাকে। পরিবারের থেকে দূরে থাকার সুবাদে পূর্ণ স্বাধীনতা পায়। তখন থাকা-খাওয়াসহ জীবন-যাপন পরিবার, অবিভাবকদের অগোচরে হয়ে থাকে। অভিভাবকরা চাইলেও অনেক কিছুই জানতে কিংবা হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। পূর্ণ স্বাধীনতা ও অবারিত সুযোগে যেমন মানুষ হওয়ার সুযোগ থাকে তেমনি বিপথগামী হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে অভিবাবকদের দায়িত্ব বর্তায় শিক্ষক সমাজের উপর। সমাজের বাস্তবতায় শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেরই বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, দুর্নীতি, মাদকসেবনসহ বিপথগামীতার অভিযোগ রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের এই অবারিত স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দায়বদ্ধতা মানুষ হওয়ার পথকে সুগম না করে কখনো কখনো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষকদের মধ্যে যারা আদর্শিক আছেন কালের বিবর্তনে, সামাজিক দায়বদ্ধতা হ্রাস পেয়েছে । এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি তো ভালো আছি, অন্যের বা সমাজের কী ক্ষতি হলো এ নিয়ে ভাবনা বা কথা বলার সময় নেই। এর পেছনে রয়েছে সমাজের অনাচারের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বিপদগ্রস্তও হওয়ার শঙ্কা।
সবকিছু থেকে নিজেকে ভালো রাখার এই যুগকে বলা যায় ইয়া নফ্সি যুগ। বাস্তবতা হলো এই ইয়া নফ্সি যুগে আসলে কেউই নিরাপদ না। কেউই জানেনা না কখন, কে, কার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন অনাকাঙ্ক্ষিত, অযাচিত বিপদগ্রস্ত হবে। বাস্তবিক অর্থে এই সমাজের অপরাধী গোষ্ঠী এখন ঐক্যবদ্ধ এবং ভালো মানুষগুলো বিভক্ত। এখন চোখের সামনে অপরাধ সংঘটিত হলেও ইয়া নফসি বলে দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কেটে যায়। এতে সমাজে মাদকাসক্তসহ, অনাচার বেড়ে যায়। ফলে, প্রকাশ্যে গুম-খুন করার মতো জঘন্য অপরাধ করেও অপরাধীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় মাদকমুক্ত, সুস্থ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও কতিপয় বিপথগামীতার নিউজ দেখা যায়। অনেকেই দায়িত্বকে ক্ষমতা হিসেবে ব্যবহার করে অন্যায়ভাবে মাদকসেবী এবং মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হওয়ার জন্য মাদক নির্মূল কাঠামো ভেঙে পড়েছে। “মাদক নির্মূলে একের পর এক অভিযান চালালেও খোদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্যের বিরুদ্ধে পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে- (২২ এপ্রিল, ২০২২- দৈনিক ইত্তেফাক)।” মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নামে যে সরকারি সংস্থা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও নির্মূলের পথ অবলম্বন না করে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অভিযানে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ হলেও আবার অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাদক সেবন এবং কারবার চলে। সমাজের বাস্তবতায় অনেকেই মনে করেন এগুলো লোক দেখানো কর্মসূচি। এমনকি গুটিকয়েক চুনোপুঁটির উপর সামান্য কঠোরতা দেখিয়ে রাঘববোয়ালদের নির্বিঘ্নে বিচরণের সুযোগ হিসেবে। তবুও এতে করে যদি সাময়িক বাধাগ্রস্ত হয় সেটাই বা কম কীসে! তবে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অধিকাংশই সুপথে থাকায় সুস্থ ধারার সমাজ বিনির্মাণে তারা মাদক সেবন, পরিবহন এবং বিক্রয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে। তারা প্রায় সময়ই মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে থাকে।
ঢাকা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে উন্মুক্ত কোনো মাঠ না থাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী এবং নানান শ্রেণি পেশার মানুষ শরীরচর্চা করতে যায়। এখানে অনেকেই আসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে আসে, কেউবা আসে ইফতার পার্টি করতে আসে। প্রেমিক-প্রেমিকারা আসেন একান্ত নীরবে পাশাপাশি বসে মনের ভাষার আদান-প্রদান করতে। কেউ গ্রুপ স্টাডি করতে আসেন, মুক্তমঞ্চ থাকায় কেউ গান লিখতে ও চর্চা করতে আসেন। একইসাথে কোনো কোনো কর্নারে মাদকসহ গাঁজা বিক্রি এবং সেবনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এমন বাস্তবতায় ঢাকার রমনা জোনের ডিসির নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক নির্মূল অভিযান শুরু হয়। মাদক সরবরাহকারী, বিক্রেতা এবং মাদকাসক্তদের তথ্য না থাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেট বন্ধ করে সবাইকে তল্লাশি করা হয়। তল্লাশির একপর্যায়ে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যুক্তি-তর্কে জড়িয়ে পড়েন। মাদকসেবীরা যে বাকপটু এবং যুক্তিযুক্ত কথা বলেন এটা তাদের সাথে আলাপ না করলে সাধারণের কাছেও বিশ্বাসযোগ্য হবে না। সন্দেহভাজন হিসেবে একাধিক ব্যক্তির সাথে যুক্তিতর্ক হয়। একটি পর্যায়ে সন্দেহভাজন হলে কিংবা ইগোর ফলে পুলিশ একজনের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়। এমনকি আইন হাতে তুলে নিয়ে একজনকে অযাচিতভাবে নির্যাতন শুরু করে। তিনি অভিযুক্ত হলেও আইন হাতে তুলে নেয়া ঠিক নয় বরং আইনী প্রক্রিয়ায় বিচার কাম্য। তাদের তল্লাশিতে আরেক তরুণ নিরাপদ বলে মনে হলে ছেড়ে দেয়, চলে যাবার সময় থাপ্পড় দিয়ে পুলিশের আমিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। পুলিশের এই অভিযানে সাংবাদিকদের সাথে নেয়ায় মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই অভিযানে যেই পুলিশ সদস্যরা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে আইন হাতে তুলে নিয়েছেন তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবুও এই ঘটনার রেশ টেনে এখনো সমগ্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা অভিযানের কর্তাব্যক্তিদের টার্গেট করে আন্দোলন করছেন। এমনকি দেশব্যাপী আন্দোলন উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অপরাধের ক্ষেত্রে যিনি অভিযুক্ত তার শাস্তি হলে ইনসাফ কায়েম হয়। যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা কর্তা ব্যক্তিদের উপর দায়িত্ব বর্তায় তবে গুটিকয়েক অপরাধীর জন্য সবাইকে অভিযুক্ত করা যুক্তিযুক্ত নয়।
এইসব মাদক বিক্রয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট গুটিকয়েক অপরাধী এবং সেবনকারীদের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ রাজধানীর বিভিন্ন পার্কগুলোতে সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত করা অযৌক্তিক। আবার মব সৃষ্টি করে প্রশাসনকে চাপে রেখে মাদক বিরোধী অভিযান বন্ধ করা যুক্তিযুক্ত নয়। এতে সমাজে মাদকাসক্তসহ অন্যায়, অবিচার, এবং অনাচার বেড়ে যাবে। প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সকল অপরাধীদের আগে শনাক্ত করে একযোগে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে সবাইকে আইনের আওতায় আনলে সাধারণ মানুষ শঙ্কামুক্ত থাকবে। একইসাথে সামাজিক বন্ধন আরো সুদৃঢ় করে মাদক নির্মূলে একে অপরের সহযোগী হওয়া সময়ের দাবি। শিক্ষক সমাজের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে হবে। পরিবারের অবিভাবকদের দরকার পরিবারের সদস্যরা বিপথগামী যাতে না হতে পারে এজন্য সুখদুঃখের অংশীদার হিসেবে সঙ্গ দেওয়া। তরুণদের মোবাইল গেম, ভার্চুয়াল মাধ্যমে সময় কমিয়ে দিয়ে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী করে তুলতে হবে। কোনো একক সংস্থা কিংবা ব্যক্তি নয় বরং সবার ঐক্যবদ্ধভাবে সহযোগিতাই সাম্য, মানবিক, বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়তে পারি।
লেখক: সাবেক গণসংযোগ সম্পাদক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ ও এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়