২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:৫০

রাজনৈতিক মাফিয়া গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় তৎপর গণমাধ্যমের একটি অংশ

মাহবুব আলম  © টিডিসি সম্পাদিত

৫ আগস্টের পর আমরা প্রত্যাশা করেছি-বাংলাদেশ সত্যিকারের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ নেবে। যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান ও কার্যকর হবে। এ বিশ্বাস থেকেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের অবস্থান ছিল সবসময় সাংবাদিকদের পক্ষে।

যখন প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার আক্রান্ত হয়েছিল, তখন আমরাই সবার আগে ছুটে গিয়েছি। কারণ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, স্বাধীন গণমাধ্যমই গণতন্ত্রের প্রধান প্রহরী।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, দেশের গণমাধ্যমের একটি অংশ জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার পরিবর্তে প্রভাবশালী অলিগার্ক ও রাজনৈতিক মাফিয়া গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় অধিক তৎপর হয়ে উঠে। গণঅভ্যুত্থানের পর ধারাবাহিকভাবে প্রোপাগান্ডা ও মনগড়া সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে আন্দোলনের সম্মুখসারীর নেতাদের বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়।

উদাহরণ হিসেবে “নগদের ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ”-এর অভিযোগটি উল্লেখযোগ্য। এনসিপির আহ্বায়ক ও সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম-কে জড়িয়ে কিছু গণমাধ্যম এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করে, যেন অভিযোগটি ইতোমধ্যেই প্রমাণিত সত্য। অথচ পরবর্তীতে স্পষ্ট হয়, নাহিদ ইসলাম উপদেষ্টা থাকাকালীন ‘নগদ’-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে, এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তার ন্যূনতম কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো “কক্সবাজারে পিটার হাসের সঙ্গে এনসিপি নেতাদের বৈঠক”! কয়েকটি গণমাধ্যম ‘সূত্রের বরাত’ দিয়ে লাইভ সম্প্রচারে দাবি করে যে- এনসিপি নেতাদের সঙ্গে কক্সবাজারের একটি হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, উল্লিখিত সময়ে পিটার হাস দেশেই ছিলেন না। তবুও কিছু গণমাধ্যম যাচাই-বাছাই ছাড়াই এই সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করে। শুধু তাই নয়, তারা এনসিপি নেতাদের চলাচলের ভিডিও ফুটেজে নাটকীয় ও ভীতিকর সাউন্ড ইফেক্ট যুক্ত করে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে- যেন তারা কোনো গোপন বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। অথচ বাস্তবে তারা ব্যক্তিগত সফরে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন।

এভাবে ভুয়া তথ্যের সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘রং মিশিয়ে’ এমন এক ফ্রেমিং তৈরি করা হয়- যা দর্শকের মনে সন্দেহ, ভয় ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক শক্তিকে পরিকল্পিতভাবে অপরাধী বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়।

এছাড়াও “সমন্বয়ক” পরিচয়ে কেউ কোনো অপকর্ম করলে, তা যাচাই না করেই সরাসরি এনসিপির সঙ্গে যুক্ত করে সংবাদ পরিবেশন করা যেন গণমাধ্যমের রুটিন দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থান থেকে গড়ে ওঠা দলটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্কিত হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা লক্ষ করা যায়।

অথচ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর তথ্যমতে, দেড় বছরে সংঘটিত ৬০০ রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে ৫৫০টিতে বিএনপি সম্পৃক্ত। সংস্থাটি এই তথ্য প্রকাশের আগে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এসব অপকর্মের ঘটনা জায়গা পায়নি।

এভাবে গত দেড়বছর গণমাধ্যম সব সংবাদ সমান গুরুত্বে প্রকাশ না করে একটি কাঙ্ক্ষিত মিথ্যা জনমত গড়ে তুলবার চেষ্টা করেছে। যার ফলে দিনে দিনে মূলধারা গণমাধ্যমের প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়েছে।

গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যদি দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে তা সহজেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এনসিপিকে ঘিরে যে বয়ান তৈরি হয়েছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংবাদ কেবল তথ্য নয়; এটি ক্ষমতারও ভাষ্য।

তরুণদের রাজনৈতিক উদ্যোগকে বিতর্কিত করা, তাদের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়া বা জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করা—এসব যদি পরিকল্পিত বয়ান নির্মাণের অংশ হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য শুভ লক্ষণ নয়। প্রয়োজন একটি দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও বহুমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল গণমাধ্যম সংস্কৃতি, যেখানে সংবাদ হবে সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যম—রাজনৈতিক ফ্রেমিংয়ের অস্ত্র নয়।

লেখক: মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)