এনটিআরসিএর প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ: আশা দেখছেন যোগ্য-মেধাবীরা, কাটছে না শঙ্কাও
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান, সহকারী প্রধানসহ শীর্ষ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এর ফলে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের পথ উন্মুক্ত হবে। তবে এ পদ্ধতিতে নিয়োগ হলে ‘আওয়ামী লীগের’ লোকজন নিয়োগ পাবে—এমন প্রশ্ন তুলে এর বিরোধীতা করছে শিক্ষকদের একটি অংশ। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের বিরোধীতা নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত রবিবার শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মতবিনিময় করে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। সভায় জোটের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। তিনি পূর্বের নিয়মে অর্থাৎ কমিটির মাধ্যমে এসব পদে নিয়োগের দাবি জানান। এর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের বড় অংশ জানিয়েছে, আগের নিয়ম অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান বা সহকারী প্রধান নিয়োগ দেওয়া হলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা থাকবে। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে যোগ্যতার পরিবর্তে অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসার পথ উন্মুক্ত হবে।
তারা বলছেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে এ পদগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া জোরদার হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক অস্থিরতাও বেড়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে তারা শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদগুলোতে মেধারভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এনটিআরসিএর কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষা আয়োজন করে মেধাবীদের নিয়োগের সুপারিশ করবে। নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করে যে কোনো শিক্ষকের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এ পদগুলোতে নিয়োগের পথ তৈরি হবে। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগের নিয়মে কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ হলে অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য যতগুলো ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ অন্যতম। সরকারের এমন যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্তের যারা বিরোধীতা করছে, তারা শিক্ষক সমাজের শত্রু।’
প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ কমিটির হাতে গেলে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আমাদের ভরসা রয়েছে। তিনি অন্যায় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না এমনটাই এমপিওভুক্ত ৬ লাখ শিক্ষক প্রত্যাশা করে। যদি শিক্ষামন্ত্রী তাদের দাবি মেনে নেয়, তাহলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেবে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোট।’
এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের বিরোধীতার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘গত ১৭ বছর এনটিআরসিএ আওয়ামী লীগের লোকজনকে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। ফলে এখন এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ হলে আওয়ামী লীগের লোকজনই নিয়োগ পাবে। সেজন্য আমরা এটি চাচ্ছি না। আগের নিয়মে এ পদে নিয়োগের দাবি জানিয়েছি।’
প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ হবে পরীক্ষার মাধ্যমে। ফলাফলে যারা এগিয়ে থাকবে তারাই নিয়োগ পাবে। তাহলে আওয়ামী লীগের লোকজনের নিয়োগ কীভাবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করব। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাদের জানিয়ে দেব।’