আইসিএমএবি যেভাবে দেশের হিসাববিজ্ঞান শিক্ষার নতুন ভবিষ্যৎ তৈরি করছে
শ্রেণিকক্ষের সীমা পেরিয়ে এখন শিক্ষা পৌঁছে যাচ্ছে ক্লাউডে—আর এই রূপান্তরের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে আছে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)। দেশের অর্থনীতি যখন ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছোঁয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন দক্ষ পেশাদার হিসাববিদের চাহিদা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষার আধুনিকতা ও অন্তর্ভুক্তিকে সামনে রেখে আইসিএমএবি যেভাবে তাদের সিএমএ প্রোগ্রামকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করেছে। এটি কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নয়, বরং দেশের হিসাববিজ্ঞান শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।
জানা গেছে, দেশে ৫০ হাজারেরও বেশি পেশাদার হিসাববিদের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে আইসিএমএবি এবং আইসিএবি মিলিয়ে রয়েছে ৪ হাজারের কাছাকাছি। অর্থাৎ হিসাববিদদের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ এবং দেশের আর্থিক নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে আইসিএমএবি সিএমএ আরও পেশাদার হিসাববিদ তৈরির উদ্যোগ গ্রহন করেছে।
হিসাববিদের সংকট একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ; যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই
দেশে বর্তমানে পেশাদার হিসাববিদের চাহিদা ৫০ হাজারেরও বেশি হলেও আইসিএমএবি আইসিএবি— এর সক্রিয় সদস্য মিলিয়ে সংখ্যাটি মাত্র ৪ হাজারের কাছাকাছি। এই ব্যবধান শুধু একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়; বরং এটি আর্থিক সুশাসন, কর্পোরেট জবাবদিহিতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য একটি বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্ন হলো, এই ঘাটতি কেন তৈরি হলো এবং এখন করণীয় কী? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পেশাদার হিসাববিজ্ঞান শিক্ষার একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এর প্রবেশযোগ্যতা। আইসিএমএবি গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সিএমএ (CMA) সার্টিফিকেশন পরিচালনা করে আসলেও শিক্ষাক্রমটি মূলত শারীরিক উপস্থিতিনির্ভর ছিল। ফলে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর শিক্ষার্থীরা এবং কর্মজীবী অনেক আগ্রহী প্রার্থী ক্লাসে অংশ নিতে পারতেন না, কার্যত তাদের জন্য এই যোগ্যতা অর্জন অসুবিধার ছিলো। ফলে সমস্যাটি মেধার ঘাটতিতে ছিল না, ছিল প্রবেশাধিকারের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায়।
দেশে ৫০,০০০-এরও বেশি পেশাদার হিসাববিদের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে আইসিএমএবি এবং (আইসিএবি–এর সক্রিয় সদস্য সংখ্যা মিলিয়ে রয়েছে ৪,০০০ জনের কাছাকাছি। ঘাটতি পূরণ এবং দেশের আর্থিক নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে আইসিএমএবি সিএমএ প্রোগ্রামে ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা তিনগুণ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য আরও পেশাদার হিসাববিদ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
আইসিএমএবি এই সমস্যার সমাধান করেছে সাহসী ও উদ্ভাবনী এক রূপান্তরের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটি প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি সিএমএ প্রোগ্রামকে অনলাইনভিত্তিক ভর্তি এবং পড়াশোনার উপযোগী করে গড়ে তুলেছে এবং তৈরি করেছে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘‘সিএমএ প্রোগ্রাম ডিজিটাল ইকোসিস্টেম”। যার ফলে যে কেউ যখন সুবিধা যেকোনো স্থান থেকে সিএমএ যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হবে।
এই প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রে রয়েছে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ‘সিএমএ স্পেস’। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এখন দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে পূর্বে ধারণকৃত লেকচার দেখার, বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী অধ্যয়নের এবং লাইভ ইন্টারঅ্যাকটিভ ক্লাসে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।একই সঙ্গে তারা মূল্যায়ন জমা দেওয়া, পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করা কিংবা শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ—সবই এখন একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারবেন। ফলে আইসিএমএবি’র হিসাববিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রটি শ্রেণিকক্ষের সীমানা পেরিয়ে নতুন এক ডিজিটাল বাস্তবতায় প্রবেশ করছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে আইসিএমএবি বাংলাদেশের প্রথম অনলাইনভিত্তিক পেশাদার হিসাববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হিসেবে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। ডিজিটাল যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হিসাববিজ্ঞান পেশার শিক্ষা ও বিকাশে একটি আধুনিক ও উদ্ভাবনী ধারা প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মাধ্যমে আইসিএমএবি একটি অগ্রগামী ও দূরদর্শী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে।
আইসিএমএবি-এর যাত্রা শুরু হয় আজ থেকে ছয় দশক আগে; ১৯৫৮ সালে। ওই বছর ‘পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকাউন্ট্যান্টস’-এর একটি শাখা হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে কস্ট ও ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিং পেশার ভিত্তি গড়ে ওঠে। যারা লক্ষ্য শিল্প ও কারখানার ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ও যোগ্য পেশাজীবী তৈরি করা; যারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পেশাদার শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর এখন আর কেবল সুবিধার প্রশ্ন নয়; এটি অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন। তবে এই সংকটের সমাধান কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হিসাববিজ্ঞান শিক্ষার মান, পেশাদার সার্টিফিকেশনের সামাজিক স্বীকৃতি এবং সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগব্যবস্থায় এই যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন, সব মিলিয়ে একটি সামগ্রিক নীতি-পরিবেশ দরকার। ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি পরিচালনায় যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন; তা রাতারাতি তৈরি হয় না। তবে সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার আলোচনা ও উদ্যোগ এখনই শুরু হওয়া জরুরি।
তথ্যমতে, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)-এর যাত্রা শুরু হয় আজ থেকে ছয় দশক আগে। ১৯৫৮ সালে ‘পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকাউন্ট্যান্টস’-এর একটি শাখা হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে কস্ট ও ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিং পেশার ভিত্তি গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির জারি করা একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ‘ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ’ (আইসিএমএবি) নামে এই পেশার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হতে থাকে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে ‘কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস আইন, ২০১৮’ পাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে আরও কাঠামোগত ভিত্তি যুক্ত হয়।
আইসিএমএবি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য শিল্প ও কারখানার ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ও যোগ্য পেশাজীবী তৈরি করা; যারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।