২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:১৭

ঝালকাঠিতে শেরেবাংলার জরাজীর্ণ জন্মভিটা, দেখার যেন কেউ নেই

টিডিসি সম্পাদিত  © টিডিসি

আজ ২৬ অক্টোবর। অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মদিন। ১৮৭৩ সালের এই দিনে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার ১ নম্বর সাতুরিয়া ইউনিয়নের মামার বাড়ি ‘সাতুরিয়া মিয়াবাড়ি’তে জন্মগ্রহণ করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই রাজনীতিক। অথচ জন্মদিনে এসেও সংরক্ষণের অভাবে তার জন্মভিটা ও স্মৃতিচিহ্নগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। দেয়ালের ইট খসে পড়ছে, কোথাও কোথাও ইটও নেই। ঝুঁকি নিয়ে জন্মভবনে বসবাস করছেন তার উত্তরসূরিরা। দীর্ঘদিন ধরে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শেরেবাংলার স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরছেন দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা। 

আইনজীবী কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ ও সাইদুন্নেসা খাতুনের ছেলে আবুল কাশেম ফজলুল হক তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছেন। অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। শোষণ ও নির্যাতনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল তার আমৃত্যু সংগ্রামের অন্যতম লক্ষ্য। 

১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। শিক্ষার প্রতিও তার ছিল গভীর অনুরাগ। মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক প্রসারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এলাকার ছেলেমেয়েদের শিক্ষার কথা চিন্তা করে ১৯৪১ সালে নিজ জন্মভূমি সাতুরিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন সাতুরিয়া এম এম উচ্চ বিদ্যালয়। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিও এখন নানা অবকাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত।

অবহেলায় ঐতিহাসিক জন্মভবন
‘বাংলার বাঘ’ নামে পরিচিত শেরে বাংলা তার নানা বাড়ি সাতুরিয়া মিয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। এই গ্রামেই তার শৈশব ও কৈশোরের উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে। স্থানীয় একটি মক্তবে তিনি লেখাপড়া করতেন। যে পুকুরে তিনি সাঁতার কাটতেন, সেটিও এখনো রয়েছে। একসময় সাতুরিয়া ছিল রাজনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।

মোঘল আমলে নির্মিত যে ভবনে শেরেবাংলা জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটিই বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনের দেয়ালের ইট খসে পড়েছে। কোনো কোনো স্থানে দেয়াল থেকে ইটও নেই। দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা। জন্মভবনের বিভিন্ন অংশে সংস্কারের অভাবে ভবিষ্যতে তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও একাধিকবার সাতুরিয়ায় এসেছিলেন শেরেবাংলা। তার ছেলে প্রয়াত এ কে ফাইজুল হকও মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু শেরেবাংলার জন্মভিটা কিংবা তার প্রতিষ্ঠিত সাতুরিয়া এম এম উচ্চ বিদ্যালয়ের অবকাঠামোয় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

জন্মভবনে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন শেরেবাংলার নিকটাত্মীয় হোসনে আরা বেগম বুলু ও তার পরিবারের সদস্যরা। ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের নিরাপদ আবাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি স্থানীয়দের।

প্রত্নসম্পদ ঘোষণা হলেও সংরক্ষণে ধীরগতি
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারের লক্ষ্যে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শেরেবাংলার জন্মস্থানকে পর্যটন স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে। পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর শেরে বাংলার জন্মভবনকে ১৯৬৮ সালের প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণ আইন, ১৯৭৬ সালে সংশোধিত, অনুযায়ী পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণযোগ্য বিবেচনা করে ভবনটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্নসম্পদ আইনের ১০ ধারা (১) উপধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার ১ নম্বর সাতুরিয়া মৌজার তিনটি খতিয়ান ও দাগের মোট দশমিক ৬১ একর জমি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ বিষয়ে ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি হয়। পরে ২০১০ সালের ১৮ মার্চের গেজেটে তা প্রকাশ করা হয়। তবে ওই জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মালিকানা স্বত্ব নিয়ে দুইজন ওয়ারিশ লিখিতভাবে আপত্তি জানালে জটিলতা দেখা দেয়। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করতে দীর্ঘ সময় চলে যায়। এখনো বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর অনেক বছর আগে শেরেবাংলার জন্মস্থানটি তাদের আওতায় নিলেও সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ তেমন দেখা যায়নি। ২০১৭ সালে শুধু শেরেবাংলার জন্মগ্রহণ করা ভবনটির ছাদ সংস্কার করা হয়। এরপর আর উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কারকাজ হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি।

শেরেবাংলার জন্মস্থানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী মো. জিসান বলেন, ‘এখানে ঘুরতে এসে কিছুই দেখতে পারছি না দেখার মতো কিছু নাই। বাড়িটাও ভাঙ্গাচুরা। সরকার যদি উদ্যোগ নিয়ে এখানে একটা জাদুঘর নির্মাণ করে এবং সেখানে শের-ই বাংলার জীবনী সম্পর্কে বইসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখা হয় তাহলে নতুন প্রজন্মের যারা আছে তারা এ বিষয়ে জানতে পারবে।’

‘সরকার আসে-যায়, কাজ হয় না’
শেরেবাংলার নিকটাত্মীয় নজরুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশে সরকার শেরে বাংলাকে মূল্যায়ন করেনি। বর্তমান সময়েও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এর পেছনেও কোনো অদৃশ্য শক্তি থাকতে পারে।

সাতুরিয়া এম এম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফজলুল হক আকন বলেন, কোনো সরকারই মহান নেতার স্মৃতি সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি। শেরে বাংলার প্রতিষ্ঠিত এম এম হাই স্কুলে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে ছয় শতাধিক ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়ের ফলাফলও ভালো। কিন্তু স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের নজর নেই।

তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালে নির্মিত বিদ্যালয়ের একটি ভবন বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভবনটি সংস্কারের জন্য একাধিকবার আবেদন করেও কোনো ফল হয়নি। একই সঙ্গে শেরে বাংলার জন্মভবনে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় তাঁর নিকটাত্মীয় হোসনে আরা বেগম বুলু ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন। সেই ভবনেরও কোনো সংস্কার বা উন্নয়নে ভূমিকা নেই।

জন্মভবনে বসবাসকারী পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর অনেক বছর আগে শেরে বাংলার জন্মস্থানটি তাদের আওতায় নিয়েছে। ২০১৭ সালে শুধু জন্মগ্রহণ করা ভবনটির ছাদ সংস্কার করা হয়। এরপর আর কোনো সংস্কারকাজ করা হয়নি।

‘ঘরটা ভেঙে গেলে শেরেবাংলার কোনো চিহ্ন থাকবে না’
শেরেবাংলার জন্মভিটা দেখাশোনার কেয়ারটেকার মোজাম্মেল হোসেন বলেন, বিভিন্ন সরকার আসে আর যায়, তবে কোনো কাজ হয় না। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন এসে ছবি তুলে নিয়ে যায়। বাড়িটি সংস্কার করা হবে, জাদুঘর করা হবে—এমন অনেক আশ্বাস দিয়ে যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি।

তিনি বলেন, ‘ঘরটা কোনোরকমে আছে। এটা যদি ভেঙে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে এখানে শেরে বাংলার কোনো চিহ্নই থাকবে না। সব শেষ হয়ে যাবে। সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, শেরে বাংলার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কিছু একটা করা হোক।’

স্থানীয় হাবিবুর রহমান মুনশি বলেন, ‘এই পুকুরে শেরেবাংলা গোসল করতেন। বর্তমানে শেরেবাংলার জন্মভিটা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। প্রশাসন যদি সুদৃষ্টিতে দেখে, তাহলে এটি থাকবে। নয়তো এর অস্তিত্ব থাকবে না।’

স্থানীয় মো. হাসান মীর বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর অনেক বছর আগে শেরেবাংলার জন্মস্থানটি তাদের আওতায় নিয়েছে। ২০১৭ সালে শুধু শেরে বাংলার জন্মগ্রহণ করা ভবনটির ছাদ সংস্কার করেছে, আর কোনো কিছুই সংস্কার করেনি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর। বর্তমান সময়েও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এর পেছনেও কোনো অদৃশ্য শক্তি থাকতে পারে।

বিদ্যালয়ের ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ
শেরেবাংলার প্রতিষ্ঠিত সাতুরিয়া এম এম হাই স্কুলে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়ের ফলাফলও ভালো। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নে নজর না থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করতে হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৬৭ সালে নির্মিত বিদ্যালয়ের একটি ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শেরেবাংলার মতো একজন জাতীয় নেতার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে।

পাঠাগার ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও থমকে আছে
শেরেবাংলার স্মৃতি সংরক্ষণ ও তার জীবন-দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ২০০৮ সালে ঝালকাঠি জেলা পরিষদ ‘শেরে বাংলা’ নামে একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এ জন্য অর্থও বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই উদ্যোগও আলোর মুখ দেখেনি।
এছাড়া সাতুরিয়ার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শেরে বাংলার নামে একটি প্রথম শ্রেণির কলেজ, ডাকবাংলো ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাতুরিয়া শুধু ঐতিহাসিক স্থান হিসেবেই নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বলেন, শেরেবাংলার জন্মভবন ও জন্মভিটা সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে শেরেবাংলার জন্মস্থানের জমির তফসিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণসংক্রান্ত কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই শেরে বাংলার জন্মভবন ও জন্মভিটা সংরক্ষণের কাজ শুরু করা যাবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু জন্মদিন বা মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ নয়, শেরে বাংলার জন্মভিটা, জন্মভবন, পুকুর, প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন স্থায়ীভাবে সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইতিহাসের এই মহান নেতার স্মৃতি ধরে রাখতে দ্রুত একটি জাদুঘর ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে—এমনটাই দাবি সাতুরিয়াবাসীর।