১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:২৩

‘হঠাৎ দরজা খুলে দেখি, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তাৎক্ষণিক আমি ও স্ত্রী নালায় লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচি’

টুপটুপ রিসোর্ট  © টিডিসি সম্পাদিত

কক্সবাজারের উখিয়া ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন। আগুনে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটি প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন রিসোর্টটিতে থাকা এক পর্যটক ও তার স্ত্রী। আগুন থেকে বাঁচতে তারা পাশের একটি নালায় লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টা ২৩ মিনিটের দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এর মধ্যেই প্রাণ হারান ১০ জন।

আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘হঠাৎ দরজা খুলে দেখি, ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তাৎক্ষণিক আমি ও আমার স্ত্রী পাশের নালায় লাফ দিয়ে বের হয়ে আসি।’ তিনি জানান, রিসোর্টটিতে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তারা ওই রিসোর্টে উঠেছিলেন। সেখানে তাদের আরও দুই দিন থাকার কথা ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়।

জানা গেছে, কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি রিসোর্টটির ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। গত জুন মাসে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতায় কর্ণপাত করা হয়নি বলে জানা গেছে। আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, শনিবার সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনের মরদেহ রিসোর্টের তৃতীয় তলার দুটি শৌচাগার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

মোরশেদ হোসেন বলেন, তীব্র বাতাসের কারণে কাঠের তৈরি রিসোর্টটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু রিসোর্টটিতে এসবের কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫) রয়েছেন। আহত ব্যক্তিরা হলেন- চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), আব্দুল মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, ঘটনাস্থল থেকে প্রথমে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুপুর ১টার পর শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের শরীর এতটাই পুড়ে গেছে যে পরিচয় শনাক্ত করার মতো অবস্থা নেই। প্রাথমিকভাবে নিহত সবাই পর্যটক বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আকতার জানান, পরে উদ্ধার হওয়া চারজনের মরদেহের অবশিষ্টাংশ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। তাদের পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে রিসোর্টের রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হতাহত সবাই পর্যটক বলে জানান তিনি। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।