২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:০৯

অপ্রতিম হত্যা, মিলছে না ৩ প্রশ্নের উত্তর

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম  © সংগৃহীত

১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অপ্রতিমের আইফোনও তুহিনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখ আনুমানিক ২টা থেকে সোয়া ২টার দিকে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখি ও পর্যালোচনা করি। এতে অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা তুহিনকে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার আগেই আমরা হেফাজতে নিই।

মো. আনিসুজ্জামান বলেন, একটানা জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন আমাদের কাছে স্বীকার করে যে, অপ্রতীমের মোবাইল আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনা করে সে তাকে ওই নির্জন ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। তুহিন আরও জানায়, এই ঘটনায় ফাহাদ এবং ফাহাদের এক বন্ধু জড়িত ছিল। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করি এবং ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার আরেক বন্ধু কামরুলও জড়িত। ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা কামরুলকে হেফাজতে নিই।

পুলিশ সুপার বলেন, তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে, প্রথমে সে আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। আইফোনটি উদ্ধারের জন্য আমরা তিন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করি। কোথাও না পাওয়ার পর অবশেষে তার স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান পরিচালনা করি। সেখানে তার দেখানো স্থান থেকে আইফোনটি আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হই। তবে পুলিশের এই বক্তব্যের পরও হত্যাকাণ্ড ঘিরে অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়- এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

হত্যার কারণ কি শুধু আইফোন?
পুলিশ বলছে, আইফোন ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় অপ্রতিমকে লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, হত্যার পর তুহিন অপ্রতিমের আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় এবং পরে সেটি তার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়।

কিন্তু পুলিশ সংবাদ সম্মেলনেই জানিয়েছে, অপ্রতিম ও আসামিদের মধ্যে অসম বন্ধুত্ব ছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের একসঙ্গে ছবি ও ভিডিও রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কি না, পূর্বপরিচয়ের সূত্র কী এবং আইফোনের বাইরে অন্য কোনো বিরোধ বা কারণ ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয় বলেও জানিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যার চূড়ান্ত ও একমাত্র কারণ কি না, নাকি এর পেছনে আরও কোনো বিষয় ছিল; এই প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি স্পষ্ট হচ্ছে না।

অন্য একটি তথ্য জানায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে অপ্রতীমের মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। ওই বিভিন্ন সময়ে কিশোরদের আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন তিনি। কেউ কেউ বলছেন, ওই ঘটনার জেরে এলাকার কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্রের কেউ কেউ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি শুধুই কিশোরদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা আইফোন ছিনতাই, নাকি ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মায়ের ওপর সেই পুরোনো আক্রোশ ও প্রতিশোধ নিতেই অপ্রতীমকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে?

অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পর সেটি তুহিনের বাসায় রাখা হয়েছিল বলে পুলিশের বক্তব্য। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবারের সদস্যদের কেউ ফোনটির বিষয়ে কিছু জানতেন কি না, জানলে কেন সেটি সরানো হয়নি এবং পুলিশের অভিযানের আগে ফোনটি অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না; এসব বিষয়ও তদন্তে পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় বলছে সংশ্লিষ্টরা।

আটক তুহিনের মা ও পুলিশের বক্তব্যে অমিল
পুলিশ সুপার জানায়, প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের মধ্যে অপ্রতিমের আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে অপ্রতিম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় প্রথমে তুহিন এবং পরবর্তীতে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তুহিন তার আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে শুক্রবার তুহিন কখন বাসায় এসেছিল, এ বিষয়ে তার মা বলেন, সে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিল। নামাজ শেষে বাসায় এসে ভাত খেয়েছে। খাওয়া-দাওয়া করে আবার বাইরে বের হয়ে যায়। পরে বিকেলের দিকে আবার বাসায় আসে। এরপর মাগরিবের আগে সে আবার বাসা থেকে বের হয়েছিল। মাগরিবের পরও কিছু সময়ের জন্য বাইরে ছিল। পরে রাতে প্রায় সাড়ে ৯টার দিকে সে আবার বাসায় আসে। এরপর ঘুমিয়ে পড়েছিল।

পুলিশ সুপার বলেন, তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে, প্রথমে সে আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। আইফোনটি উদ্ধারের জন্য আমরা তিন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করি। কোথাও না পাওয়ার পর অবশেষে তার স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান পরিচালনা করি। সেখানে তার দেখানো স্থান থেকে আইফোনটি আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হই।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের ভেতরে অপ্রতীমের আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতীম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় প্রথমে তুহিন এবং পরবর্তীতে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তুহিন অপ্রতীমের আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া আমরা সিয়াম নামে আরেকজনকে আটক করেছি। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছি।

জেলা পুলিশ সুপার বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করেছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বিষয় এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে যাচ্ছি। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুতই পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা হবে। আমরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে আবেদন রাখব, রামিসা হত্যার মামলাটি যেমন দ্রুত রায় এসেছে, এই মামলাটিও যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়।