শোষণের শিকল ভাঙতে শিক্ষিত ও সচেতন হতে হবে: সারজিস আলম
পাহাড় কিংবা সমতল-শোষক ও দুঃশাসক শ্রেণি সবসময় চায় মানুষকে নির্ভরশীল ও বিভক্ত করে রাখতে। মানুষ শিক্ষিত, সচেতন ও প্রতিবাদী হয়ে উঠলে কোনো শোষণ-নির্যাতনের মসনদই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেলে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের অরুণিমা কমিউনিটি সেন্টারে এনসিপির সাংগঠনিক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সারজিস আলম বলেন, ‘যাদের ওপর জুলুম করা হয়, তারা যদি শিক্ষিত হয়ে যায়, কথা বলতে শুরু করে এবং প্রতিবাদ করতে শেখে, তাহলে শোষকদের বড় বড় চেয়ার ও মসনদ আর টিকে থাকে না। কারণ মানুষ যখন কথা বলতে শুরু করে, তখন কোনো স্বৈরাচারই টিকতে পারে না।’
তিনি বলেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অর্থনৈতিক সংকট ও ঋণের চক্রে আটকে রাখা হলে তার পক্ষে সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার চিন্তা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন মানুষের দৈনিক প্রয়োজন যদি ৫০০ টাকা হয়, অথচ আয় হয় ৪০০ টাকা, তাহলে বাকি ১০০ টাকার জন্য তাকে ঋণ করতে হয়। এভাবে মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও ঋণের চিন্তায় আটকে পড়ে এবং একসময় তথাকথিত নেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, ‘যে মানুষ নিজের তিনবেলা খাবারের নিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তিত, সে কীভাবে সন্তানের উচ্চশিক্ষার কথা ভাববে? যার মাথায় ঋণের বোঝা, সে কীভাবে সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচের চিন্তা করবে? পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও তার থাকে না।’
এনসিপির এই নেতা বলেন, এ ধরনের বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে একটি শ্রেণি মানুষকে বছরের পর বছর ‘প্রজা’ বানিয়ে রাখে। মানুষের নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে এই নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি আমরা এ কারণেই দিয়েছি—যেন জনগণকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে রাখা না যায়। নাগরিক হবে এক পরিচয়ে। পঞ্চগড়ের একজন নাগরিক যে সুবিধা পাবেন, ঢাকার একজন নাগরিকও সেই সুবিধা পাবেন; খাগড়াছড়ির প্রত্যেক নাগরিকেরও সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’
সারজিস আলম আরও বলেন, সংবিধান, সংসদ কিংবা আইন যত শক্তিশালীই হোক, মানুষের নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা না গেলে সেগুলোর প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না।
খাগড়াছড়ির শিক্ষিত তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের অনেক সন্তান প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন, অনেকে দেশের বাইরেও যাচ্ছেন। তাদের প্রতি আহ্বান—আপনারা যে শিক্ষা ও সচেতনতা অর্জন করেছেন, তা নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবেন না। আপনাদের এলাকার মানুষের কাছে অধিকার ও সচেতনতার কথা পৌঁছে দিন।’
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভাজনের রাজনীতি প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, শাসকদের অন্যতম কৌশল হলো ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’—বিভাজন করে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করা। পার্বত্য জেলাগুলোতে বিভিন্ন বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে একটি শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘একসময় যারা শত টাকার মালিক ছিল, তারা হাজার টাকার মালিক হয়েছে; হাজার থেকে লাখ, লাখ থেকে কোটি টাকার মালিক হয়েছে। তাদের সন্তানরা খাগড়াছড়িতে তো দূরের কথা, অনেক সময় বাংলাদেশেও থাকে না—ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকায় থাকে। তাহলে পরিবর্তনটা কাদের হচ্ছে, ফায়দাটা কারা নিচ্ছে—এই প্রশ্ন আপনাদের চিন্তা করতে হবে।’
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরে সারজিস আলম বলেন, ‘আমাদের এই জুলাইয়ের বাংলাদেশ কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির আধিপত্য কায়েমের বাংলাদেশ নয়। একই সঙ্গে এটি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদীর বাংলাদেশও নয়। এই বাংলাদেশ হচ্ছে পাহাড় ও সমতলের প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করার বাংলাদেশ।’
তিনি বলেন, ‘ঐক্য মানেই একরূপতা নয়। সবাইকে বাঙালি হতে হবে,এমন নয়। যে বাঙালি, সে বাঙালি; যে মারমা, সে মারমা; যে চাকমা, সে চাকমা; যে গারো, সে গারো,যে বাঙ্গালি সেই বাঙ্গালি,। আমাদের বৈচিত্র্য থাকবে, কিন্তু এই বৈচিত্র্য মানেই বিভাজন নয়। বরং এই বৈচিত্র্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পারস্পরিক বৈরিতা পরিহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেকের অধিকার লাগবে। কিন্তু অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমাদের মধ্যে কোনো বৈরিতা থাকা যাবে না।’
দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সারজিস আলম বলেন, বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দ, নিয়োগ ও সরকারি সুযোগ-সুবিধাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন বা লুটপাট হলে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনার অধিকারের টাকা, উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা কিংবা কোনো কাজের টাকা যদি কেউ লুটপাট করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। স্থানীয় নির্বাচনে তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিতে হবে। তা না হলে কোনোদিন খাগড়াছড়ির পরিবর্তন সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্য জেলার মানুষ এসে খাগড়াছড়ির পরিবর্তন করে দিয়ে যাবে না। এই পরিবর্তনের দায়িত্ব আপনাদেরই নিতে হবে।’
সারজিস আলম বলেন, মানুষের বিবেকবোধকে জাগ্রত করতে হবে। ন্যায়কে ন্যায় এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস তৈরি করতে হবে। সচেতনতা, শিক্ষা, প্রতিবাদ ও সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব।
এ সভায় এনসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার,যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ,বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজাউদ্দীন,স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা উপযুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত,খাগড়াছড়ি জেলার এনসিপির আহ্বায়ক নূর আলম সিদ্দিকীসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।