২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৩

খাটের পাশে পড়েছিল আয়ুশ, সিঁড়িতে প্রীতিলতা-আগামী, ছাদে মেলে গণপতির লাশ— ঝলসানো ছিল ৪টি মুখই 

নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী  © সম্পাদিত

খাটের পাশে পড়ে ছিল আয়ুশের নিথর দেহ। সিঁড়ির ধাপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রীতিলতা ও আগামীর শেষ চিহ্ন। আর ছাদের ওপর মেলে গণপতির লাশ। একই বাড়ির ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে পড়ে থাকা লাশগুলো ঘিরে তৈরি হয় শোক, আতঙ্ক আর অসংখ্য প্রশ্ন। খাট, সিঁড়ি ও ছাদ; প্রতিটি স্থানই যেন নীরব সাক্ষী হয়ে আছে এক মর্মান্তিক ঘটনার। কোথায়, কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে থেমে গেল এই জীবনগুলো; তার উত্তর খুঁজতেই এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের দিকে।

রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ায় তালাবদ্ধ ওই বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে বাড়িটির তালা ভেঙে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা বলে ধারণা করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে কিভাবে এবং কেন চারজনকে হত্যা করা হয়েছে, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহতরা হলেন- রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১২)। চারজনের মরদেহ বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় দোতলা বাড়ির ছাদে। তার স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে প্রার্থীর মরদেহ পড়ে ছিলো ছাদে ওঠার সিঁড়িতে। আর ছেলে প্রীয়মের মরদেহ পাওয়া যায় একটি খাটের নিচে। বাড়ির ভেতরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র ছিলো এলোমেলো অবস্থায়।

গণপতি চক্রবর্তীর গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই মারা গেছেন। আরেক ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অসুস্থ, গ্রামেই থাকেন। গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, গণপতি চক্রবর্তী আগে রংপুর নগরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া থাকতেন। ২০১০ সালে মাছুয়াপাড়া গ্রামে ৬ শতাংশ জমি কেনেন। তিন বছর আগে সেখানে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। অবসর জীবনে তিনি হোমিও চিকিৎসা দিতেন। এমন ভালো একজন মানুষ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কেউ এভাবে মেরে ফেলতে পারে, তা তিনি ভাবতেও পারছেন না।

পুলিশ ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকতেন। ভবনের প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ এখনো চলছে। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। আর তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। তাঁর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল।

রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, চারজনেরই মুখ কিছুটা ঝলসানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মুখে রাসায়নিক–জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েকদিন ধরে বাড়িটি তালাবদ্ধ ছিলে। গত বৃহস্পতিবারের পর থেকে পরিবারের কাউকে বাইরে দেখা যায়নি। শনিবার রাতে বাড়ির ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রধান গেটের তালা ভেঙে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে সর্বশেষ মুঠোফোনে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপর শনিবার পরিবারের সদস্যদের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে না পেয়ে রাতে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ওই বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে প্রধান গেট বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ ফোন করলে কোতোয়ালি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।

রংপুর সিআইডির ইনচার্জ সুমিত চৌধুরী বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি ডাকাতির ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না। তদন্তের পর ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা জানা যাবে।

রংপুর মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের জানান, মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও তদন্তকারী সংস্থাও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ করছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী পড়ত রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে।

একটি পরিবারে চারজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক। কেন একই পরিবারের চার সদস্যকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো, বাড়িটি বাইরে থেকে কেন তালাবদ্ধ ছিল এবং ঘটনার সঙ্গে ডাকাতির যোগসূত্রই বা কতোটা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।