১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০৩

বিটিআরসি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ ভিটিএস চক্রের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ

অভিযুক্ত কর্মকর্তা দাউদ খান ও অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের মালিক মাকসুদুল আলম  © সংগৃহীত

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার এক আসামির সঙ্গে প্রমোদভ্রমণের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরেই যোগসাজশ ও গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ এবং চক্রের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তার নাম দাউদ খান মজলিশ। তিনি বিটিআরসির স্পেকট্রাম ডিভিশনের উপ-সহকারী পরিচালক। একটি অননুমোদিত ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সার্ভিস (ভিটিএস) প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যৌথ অভিযান দলের সদস্য ছিলেন তিনি।

অভিযান পরিচালনার পর দায়ের করা হয় মামলা। মামলার বিবরণী অনুযায়ী, গত ২০২৪ সালের ১৪ মে রাজধানীর মিরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়ার (সাউথ পীরেরবাগ) একটি অ্যাপার্টমেন্টে বিটিআরসি ও র‍্যাব-১০ এর যৌথ দল অভিযান চালায়। এ সময় ‘মাকসুদ টেকনোলজি’ নামের একটি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. মাকসুদুল আলম (৩৭) এবং তার সহযোগী মো. রায়হান উদ্দিনকে (২৫) আটক করা হয়। পরে ১৫ মে লাইসেন্স বা কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই অবৈধ ভিটিএস সেবা পরিচালনার অভিযোগে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।

অভিযানকালে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৩টি জিপিএস ট্র্যাকার, ১৯টি রিলে, ৫টি অটোলক রিমোট এবং ১৪টি সিম কার্ড জব্দ তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার অবৈধ ভিটিএস ডিভাইস থাকলেও মাত্র নামমাত্র কিছু ডিভাইস জব্দ তালিকায় দেখানো হয়েছে।

অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সন্দেহভাজন ব্যক্তির ডিভাইস জব্দ করলেও বিটিআরসি কর্মকর্তা দাউদ খান মজলিশের বিরুদ্ধে তাকে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এছাড়া মামলার শুরু থেকেই প্রমাণ গোপনের চেষ্টা, জব্দ তালিকা ছোট করা এবং আইনি প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার পেছনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি প্রধান আসামি মো. মাকসুদুল আলম তার ফেসবুকে বিটিআরসি কর্মকর্তা দাউদ খান মজলিশের সঙ্গে একটি প্রমোদভ্রমণের বেশ কিছু ছবি পোস্ট করার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ছবিতে দুজনকে নৌভ্রমণে অবসর সময় কাটাতে দেখা যায়। মামলার একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আসামির এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিটিআরসির স্পেকট্রাম ডিভিশনে আইএমইআই রেজিস্ট্রেশন, ওয়্যারলেস সরঞ্জাম এবং বিটিআরসির সার্ভারে ভিটিএস ডিভাইস নিবন্ধনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা দাউদ খান মজলিশের বিরুদ্ধে ‘মোটলক’-এর অবৈধ ও অনুমোদনহীন ভিটিএস ডিভাইসগুলো বিটিআরসির অফিসিয়াল ডেটাবেজে নিবন্ধনে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শৃঙ্খলার মারাত্মক লঙ্ঘন হবে। যার মাধ্যমে মূলত কোনো বৈধ অনুমোদনহীন ডিভাইসকে আইনি সুরক্ষার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে এবং অভিযুক্তদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

চলমান ফৌজদারি মামলা সত্ত্বেও আসামির জামিন পাওয়া এবং অবৈধ ভিটিএস সেবা নির্বিঘ্নে চালু থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। কেন বিটিআরসি এ বিষয়ে নতুন কোনো আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা। শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বিটিআরসির নিষ্ক্রিয়তার পেছনে দাউদ খান মজলিশ ও তার সহযোগীদের সিন্ডিকেট কাজ করছে।

মামলাটি এখনও পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। একবার নিষ্পত্তি হলেও ‘না রাজি’ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চলমান রয়েছে।-তারেক হাসান সিদ্দিকী, পরিচালক (লিগ্যাল), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো বিটিআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং অবৈধ ভিটিএস পরিচালনাকারীর মধ্যকার গভীর যোগসাজশ ও স্বার্থের সংঘাতে বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলেছে, যা দেশের টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত ভিটিএস অপারেটররা কর্মকর্তা দাউদ খান মজলিশের কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, তার তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হওয়া সকল আইএমইআই নিবন্ধনের পূর্ণাঙ্গ অডিট এবং ২০২৪ সালের মে মাস থেকে অবৈধ ভিটিএস অপারেটরদের বিরুদ্ধে অভিযান কেন স্থবির হয়ে আছে—তার একটি সামগ্রিক তদন্ত দাবি করেছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা দাউদ খান। অভিযানে সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা র‌্যাবের অভিযান ছিল। আমি দলের একজন সদস্য ছিলাম। অভিযানের সময় তাকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করার প্রশ্নই আসে না। আর আমার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন তাকে ব্যবহার করতে দেওয়ার সুযোগও আমার নেই।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ছবিগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, মাস দুয়েক আগে আমার বন্ধুদের সঙ্গে ট্যুরে গেলে মকসুদুল আলমের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমার পূর্ব পরিচিত। সেখানে আমরা ছবি তুলেছিলাম। সেগুলো হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছে।

মামলার বাদী বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের উপসহকারী পরিচালক রিয়াদ হোসেন বলেন, অনেক দিন আগের ঘটনা । এখন জানা নাই। আমাদের লিগ্যাল শাখায় কথা বলে দেখতে পারেন।

মামলার বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের পরিচালক (লিগ্যাল) তারেক হাসান সিদ্দিকী বলেন, মামলাটি এখনও পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। একবার নিষ্পত্তি হলেও ‘না রাজি’ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চলমান রয়েছে।