মাজারের ডেগ খুলে দিলেন ডিসি সারওয়ার
হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা সিলগালা করা তিনটি ডেগের তালা খুলে দিয়েছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলম। একইসঙ্গে প্রশাসনের স্থাপন করা দানবাক্সগুলো খুলে গত পাঁচ দিনে জমা হওয়া অর্থ গণনার কাজ শুরু হয়েছে। সোমবার (২২ জুন) বিকাল ৩টার দিকে দানবাক্সগুলো খোলা হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজারে উপস্থিত হয়ে এসব কার্যক্রমের তদারকি করেন। এর আগে প্রশাসনের উদ্যোগে সিলগালা করা ডেগগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং নতুনভাবে স্থাপন করা দানবাক্সগুলো খুলে হিসাব নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন। এর বদলে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে নতুন দানবাক্স স্থাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যও নিয়োজিত করা হয়।
সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা জানান, সোমবার সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম শাহজালাল (রহ.) মাজারে জোহরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে বেলা প্রায় ২টার দিকে প্রশাসনের উপস্থিতিতে সিলগালাকৃত ডেগ ও দানবাক্সের তালা খোলা হয়। এ সময় ডেগ ও দানবাক্স থেকে বস্তাভর্তি টাকা বের করা হয়। পরে সেগুলো গণনার জন্য নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হয়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত টাকার গণনা কার্যক্রম চলমান ছিল বলে জানা গেছে। তিনি আরও জানান, দানের অর্থ গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে মোট প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিলেটে যোগ দেওয়ার পর শুরুতে বেশ কিছু উদ্যোগের জন্য প্রশংসা কুড়ান সারওয়ার আলম। তবে সম্প্রতি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার জন্য প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে রোষানলে পড়েন তিনি। গত ১২ জুন মাজার পরিদর্শনে গিয়ে তিনি আয়-ব্যয়ের হিসাব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। এরপর গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারের পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স বসানো হয়। একই সঙ্গে মানুষের দান রাখার ঐতিহাসিক তিনটি ডেকও সিলগালা করা হয়। নতুন দানবাক্সের নিরাপত্তায় আনসার সদস্য নিয়োগ এবং সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগও নেন তিনি।
শুধু দান ব্যবস্থাপনাই নয়, মাজার এলাকায় মদ, গাঁজা ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছিলেন সারওয়ার আলম। তার দাবি ছিল, মাজারের আয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই; ফলে জনস্বার্থে এই খাতে প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন। তবে মাজার-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শত বছরের রেওয়াজ ভেঙে প্রশাসন মাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। তাদের ভাষ্য, বিষয়টি ভক্ত-অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে।
এ ঘটনার পর জেলা প্রশাসকের পক্ষে-বিপক্ষে জোরালো আলোচনা শুরু হয়। একপক্ষ তার উদ্যোগকে দুর্নীতি ও অনিয়ম ঠেকানোর সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, অন্যপক্ষ একে ধর্মীয় ঐতিহ্যে অযাচিত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বলে আখ্যা দেয়। বিশেষ করে মাজারের ঐতিহাসিক ডেগ সিলগালা এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে দানবাক্স স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলেন তারা। শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের জেরেই সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে জোর আলোচনা রয়েছে। যদিও সরকারিভাবে তার বদলির কারণ জানানো হয়নি।
প্রসঙ্গত, ২৭তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সারওয়ার আলম র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দেশজুড়ে আলোচিত ছিলেন। ভেজালবিরোধী অভিযানে তিন শতাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। পরে ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর তাকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তিনি উপসচিব পদে পদোন্নতি পান। সিলেটে ডিসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও নানা ব্যতিক্রমী উদ্যোগে তিনি আলোচনায় ছিলেন। তবে শাহজালাল (রহ.) মাজার ইস্যুতে তার সর্বশেষ পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত তার প্রশাসনিক অবস্থানই নড়বড়ে করে দিল।