০৫ জুন ২০২৬, ২১:১০

যেকোনো সময় ছাত্রদলের কমিটি, কপাল পুড়তে পারে বিতর্কিতদের

ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে আলোচনায় এগিয়ে যারা  © টিডিসি সম্পাদিত

গত মার্চের শুরুতেই সরকারি দল বিএনপির প্রধান সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের রাকিব-নাছির কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর থেকে প্রতিনিয়তই গুঞ্জন ছিল নতুন কমিটির। সর্বশেষ ঈদুল আজহার পর বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর সেই গুঞ্জন আরও বেড়েছে। ফলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক—শীর্ষ এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পদকে ঘিরে ভেতরে-বাইরে চলছে শেষ মুহূর্তের নানা সমীকরণ, লবিং ও আলোচনা। পাশাপাশি শুরু হয়েছে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ ও তদবির। 

জানা গেছে, ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শের পাশাপাশি পদপ্রত্যাশীদের বিগত দিনের আমলনামাও বিবেচনায় নিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ একসঙ্গে শীর্ষপদগুলো ঘোষণা করতে পারেন। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ১ মার্চ কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাত সদস্যবিশিষ্ট নতুন আংশিক কমিটি অনুমোদন করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও ৫ আগস্টের আগে মামলায় জর্জরিত, হাসিনা রেজিমে নির্যাতিত যোগ্য ও ত্যাগীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাদের ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বে মূল্যায়ন করা হবে না বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।

পাশাপাশি ক্ষমতা হারানোর দেড়যুগ পর পুনরায় ক্ষমতায় এসে ছাত্রদলের কমিটিতে যাতে কোনো বিতর্কিতদের স্থান না হয়, সেজন্য সরকারি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে যাদের প্রতিবেদন নেতিবাচক আসবে, তারা দলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী হলেও নেতৃত্বে স্থান পাবেন না। ফলে কপাল পুড়তে পারে এসব পদ প্রত্যাশী ছাত্রদল নেতাদের।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠনের সমন্বয়ক ও স্বাক্ষরকারী হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। তিনি বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বেও আছেন। ছাত্রদলসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নতুন কমিটির বিষয়ে রিজভী আহমেদ ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘নতুন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো গঠনের মূল লক্ষ্য হলো বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা জোরদার করা এবং দেশব্যাপী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো আরও গতিশীলভাবে বাস্তবায়ন করা। সেই আলোকে বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোকে নতুন কমিটির মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রদলের কমিটিও একই ধারাবাহিকতায় আসবে।’

রুহুল কবির রিজভী জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিএনপির ওয়ার্ড থেকে জাতীয় পর্যায় এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো স্তরের কমিটিতেই অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে যুক্ত করা যাবে না।

নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন কমিটিগুলোতে পুরোনো ও পরীক্ষিত নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখার পাশাপাশি দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় বাইরের লোক অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

বাদ যাচ্ছেন সিনিয়ররা
ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ২০০৬-২০০৭ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। এই সেশনেরও কয়েকজন এবারের কমিটির পদপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী বিবেচনায় ২০০৬-২০০৭ সেশন ও তার পরের কয়েকটি ব্যাচও বাদ পড়তে পারে। তবে অপেক্ষাকৃত জুনিয়ররাও কমিটিতে আসার সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রে ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১১-১২ এবং ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী দিয়ে কমিটি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে কারা নেতৃত্বে আসবে সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান বলে জানিয়েছেন বিএনপির নীতি নির্ধারক ও সিনিয়র নেতারা।

শীর্ষ পদে আলোচনায় যারা
সূত্রে জানা গেছে, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠের ভূমিকা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে এবার ছাত্রদলের নেতৃত্বের মূল মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে। যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তারাই নেতৃত্বে এগিয়ে থাকবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনকে সামনে রেখে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে আলোচনায় রয়েছেন অন্তত ডজন খানেক সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশী। 

এরমধ্যে সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও ঢাবি শাখার সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল ছাড়াও এগিয়ে রয়েছেন রাকিব-নাছির কমিটির সুপার ফাইভের (শীর্ষ ৫ নেতা) সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান ও প্রচার সম্পাদক (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদা) শরিফ প্রধান শুভ।

এরমধ্যে শুধু ২০০৮-০৯ সেশনের সোহেল। বাকিরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৯–১০ সেশনের শিক্ষার্থী। এরপরের ব্যাচে এগিয়ে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম তারিক, তারা ২০১০-১১ সেশনের শিক্ষার্থী।

পরদিকে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসেবে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকা যুগ্ম সম্পাদক সাধারণ মো. রাজু আহমেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুর রহিম রনি, তারেক হাসান মামুন ও মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মাহমুদ ইসলাম কাজল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওন ও ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সাবেক নেতা, বিএনপি মিডিয়া সেলের যোগাযোগ সমন্বয়ক করা জার্মানভিত্তিক কনরাড এডিনাওয়ার স্কুল ফর ইয়ং পলিটিশিয়ান্সের রাজনৈতিক ফেলো দ্বীন ইসলাম খানও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসেবে জোরেশোরে আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১–১২ সেশনের শিক্ষার্থী। এছাড়া ২০১২-১৩ সেশন থেকে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পাঠাগার সম্পাদক তৌহিদুল ইসলামও। 

কপাল পুড়তে পারে বিতর্কিতদের
জানা গেছে, নারীর সঙ্গে অনৈতিক সর্ম্পক, চাঁদাবাজি ও অপহরণ, অস্ত্র ব্যবসার মতো বিতর্কিত ঘটনায় জড়িত থাকারাও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পদে ঠাঁই পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। তবে বিএনপি ক্ষমতায় থাকায় এসব বিতর্কিতদের নিয়ে সতর্ক রয়েছে হাইকমান্ড। ফলে সরকারের একাধিক সংস্থা কয়েক দফায় ক্যাম্পাস ও নিজ এলাকায় খোঁজ-খবর নিয়েছে পদপ্রত্যাশীদের। কয়েকজন পদপ্রত্যাশী বিষয়টি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন।

গত বছরের শেষের দিকে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মারধর করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগে একটি মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের এক নেতা গ্রেপ্তার হয়ে কয়েকদিন জেলেও ছিলেন। ওই নেতাসহ কয়েকজন মিলে সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ ছিল।

অস্ত্র ব্যবসা ও স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত রয়েছেন বলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় এক নেতা বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে তাকে গ্রেপ্তারের পর তদন্ত করতে গিয়ে ওই নেতার মোবাইল ফোন ঘেটে ১১টি বিদেশি অস্ত্রের ছবি পেয়েছিল গোয়েন্দা পুলিশ। তথ্য পেয়েছিল অস্ত্র সরবরাহকারী দুই ডিলার সম্পর্কেও। তবে সেটা সেই সময় রাজনৈতিক ঘটনা বলে দাবি করা হয়েছিল বিএনপির পক্ষ থেকে। 

এদিকে, নিজে ছাত্রদলের পদধারী হলেও তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যরা জামায়াত কিংবা কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে এমন কেউ ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে সুযোগ পাবে না বলে সূত্র জানিয়েছে। 

বিগত কয়েক কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পরিবারও এরকম ছিল বলে ছাত্রদলে অভিযোগ রয়েছে। এবারও বেশ কয়েকজন পদপ্রত্যাশীর পরিবার জামায়াত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রদলের বেশ কয়েক পদধারী ও নতুন কমিটিতে পদপ্রত্যাশী নেতা আগে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে জানা গেছে। সরকারের একাধিক সংস্থা ও বিএনপির হাইকমান্ড নিজস্ব লোক মারফত দফায় দফায় ক্যাম্পাস ও নিজ এলাকায় খোঁজ খবর নিয়ে নেতৃত্ব নির্ধারণ করছেন। যারা কারণে এসব পদপ্রত্যাশীদের কপাল পুড়ছে তা নিশ্চিত।