০৩ জুন ২০২৬, ১৩:১৫

যে হাত বই তৈরি করে সেই হাতেই ওঠে না পাঠ্যবই

প্রেসে কর্মরত শিশুরা  © টিডিসি

‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ কিংবা শৈশবে শিশু থাকবে বিদ্যালয়ে, খেলার মাঠে কিংবা মায়ের কোলে। কথাগুলো সুন্দর শোনা গেলেও বাংলাদেশের সব শিশু সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেড়ে ওঠে না। পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা বই বাঁধাই ও ছাপাখানায় দেখা মেলে শিশুরা কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বই পড়ার বয়সে বই তৈরি করছে শিশুরা। বঞ্চিত হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠ থেকে।

প্রেসে কাগজের জোগান দেওয়া, প্রেস চালনা করা, বই বাঁধাই করাসহ বিভিন্ন কাজে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কারখানাগুলোয় খালি পা আর মুখে মাস্ক ছাড়াই সারা দিন কাজ করে তারা। রাতে ঘুমায় কারখানারই ঘিঞ্জি পরিবেশে। এতে বাড়ছে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব শিশু পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে দুরন্ত শৈশব। নষ্ট হচ্ছে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।

বাংলাদেশ শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, শিশু বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তি, যার বয়স ১৮ বছরের কম। এ ছাড়া জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি) অনুসারে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে শিশু হিসেবে ১৮ বছরের কম বয়সী সবাইকে গণ্য করা হয়েছে, যদি না কোনো দেশের আইন অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স আরও কম নির্ধারিত হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, পুরান ঢাকার পাতলা খান লেন, প্যারীদাস লেন, হেমেন্দ্রদাস লেন, তনুগঞ্জ লেন, শিশিরদাস লেনসহ বাংলাবাজারের আশপাশের বিভিন্ন স্থানের প্রেসগুলোয় সবাই বই ছাপানো, মেশিন চালানো কিংবা বই বাঁধাইয়ের কাজে ব্যস্ত। কারখানার বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করা আছে কাগজ ও বই। এসব কারখানার অধিকাংশ শিশুর বয়স ১১ থেকে ১৫ বছর। তাদের হাতে-মুখে নেই মাস্ক। এমনকি কিছু শিশুর গায়ে কাপড় ছিল না।

রিফাত (১১) নামের এক শিশু বরিশাল থেকে কাজের উদ্দেশ্যে এসেছে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে। তাকে দেখা গেছে খালি গায়ে বই বাইন্ডিংয়ের কাজ করতে। একটু দূরে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে নিচু স্বরে বলে, ‘আমি এই কারখানায় কাজ করি প্রায় দুই বছর ধরে। সকালে এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকি। ২০০ টাকা ইনকাম করতে পারি। আগে স্কুলে যেতাম। স্কুলে যেতে এখন আর ইচ্ছা করে না। আমার বাবা অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। ঘরে ছোট ভাই-বোন আছে। তাদের খাওয়ানোর জন্যই আমাকে কাজ করতে হয়। কাজ না করলে সংসার চলবে না।’

পুরান ঢাকার পাতলা খান লেন, প্যারীদাস লেন, হেমেন্দ্রদাস লেন, তনুগঞ্জ লেন, শিশিরদাস লেনসহ বাংলাবাজারের আশপাশের বিভিন্ন স্থানের প্রেসগুলোয় সবাই বই ছাপানো, মেশিন চালানো কিংবা বই বাঁধাইয়ের কাজে ব্যস্ত। কারখানার বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করা আছে কাগজ ও বই। এসব কারখানার অধিকাংশ শিশুর বয়স ১১ থেকে ১৫ বছর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিশু বলে, ‘আমার কাজ হলো প্রিন্ট হওয়া কাগজ এক স্থান থেকে কারখানার ভেতরেই অন্য স্থানে রাখা। এর বাইরেও মালিকের চা-সিগারেট এনে দিতে হয়। কাজ না করলে টাকা পাব কই?’

আরেক শিশু তানভীর বলে, ‘আগে স্কুলে যেতাম। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম। এখন শুধু কাজ আর কাজ। যখন দেখি অন্য বাচ্চারা স্কুলে যায়, তখন মন খারাপ হয়। যদি সুযোগ পাইতাম, তাহলে পড়ালেখা করে ভালো কিছু হইতাম। বাবার সঙ্গে মায়ের এক ঝগড়ার পড়াশোনার পথ বন্ধ হয়ে গেছিল। তারপর একদিন মা মারা যায়। তারপর এখানে চলে আসি। অনেক কষ্ট হয়।’ কথার এক পর্যায়ে অন্য শিশুদের সঙ্গে তুলনা করে আক্ষেপ করেই তানভীর বলে, ‘আমরা বানাই, তারা বই পড়ে।’

নতুন পাঠ্যবই

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান এবং দোহার প্রিন্টিং প্রেসের প্রোপ্রাইটার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেক সময় শ্রমিক কম থাকার কারণে অনেকে শিশুদের কাজে নেয়। তবে আমরা আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে নিষেধ করে থাকি। সমিতির পক্ষ থেকে আমরা শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করেছি। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ মিললে আমরা প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবে শোকজ দিয়ে থাকি।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার স্টাফ আইনজীবী সালমা সুলতানা বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের বিভিন্ন কারখানায় কাজে লাগানো হচ্ছে। একপর্যায়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে অনেক শিশু। মাদক, ছিনতাই, লুটসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে তার। সমস্যা সমাধানে সরকার গোড়ায় হাত দিতে হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি উপযুক্ত হাতের কাজের ব্যবস্থা  করতে হবে। যারা বই বাঁধাই, মুদ্রণশিল্প কারখানার মালিক রয়েছেন, তাদের সচেতন হতে হবে। তবে মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকে।’