২১ মে ২০২৬, ১৮:১৬

যে বাগানের লিচু সবার জন্য উন্মুক্ত

মোস্তফা জামাল শামীমের উন্মুক্ত লিচু বাগান  © টিডিসি ফটো

জ্যৈষ্ঠ মাসের রসালো ফল লিচু। থোকায় থোকায় ঝুলছে গাছে। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় লাল টকটকে সুমিষ্ট ফলটি। তবে এর জন্য নিতে হয় না কারো অনুমতি। পেট ভোরে খাওয়া যায়, নেওয়াও যায় পরিবারের জন্য। অথচ দিতে হয় না কোনো টাকা।

বর্তমান সময়, বাস্তবতা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় ব্যাপারটা শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্য। পাবনায় রয়েছে এমনই একটি লিচুর বাগান, যেখান থেকে সাধারণ মানুষ নিজ হাতে পেড়ে খেতে পারেন লিচু।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আলোকদিয়ার গ্রামের কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম গড়ে তুলেছেন এই লিচুর বাগানটি। ৮ বিঘা জমির উপর ২০০ এর অধিক লিচু গাছের সমন্বয়ে গড়া এই বাগানে রয়েছে নানান জাতের লিচু। শুধু মানুষই নয়, এই বাগানের লিচু পশু-পাখির জন্যও উন্মুক্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে সেই বাগানের দৃশ্য।

স্থানীয়রা জানান, এলাকার মানুষ, দরিদ্র, দর্শনার্থী ও বন্ধু-স্বজনদের কথা চিন্তা করে উদ্যোগটি নিয়েছেন বাগান মালিক ব্যবসায়ী ও পাবনার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কিমিয়া সেন্টারের স্বত্বাধিকারী কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম। যিনি চিকিৎসার পাশাপাশি, শিক্ষাবৃত্তি, মেধাবৃত্তি, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মণ্ডলে স্থানীয়ভাবে বেশ খ্যাতি কুড়িয়েছেন। ব্যাবসার পাশাপাশি তিনি শহরের প্রাণকেন্দ্র আব্দুল হামিদ সড়কে পাবনা কলেজ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষি বিষয়ে শিক্ষকতাও করছেন।

জানা যায়, প্রায় দেড় যুগ আগে তিনি পৈতৃক ও নিজের কেনা জমিতে এই লিচুর বাগান করেন। যেখানে নানা জাতের লিচুতে পরিপূর্ণতা পায়। খাবার উপযোগী হলেই স্থানীয় গ্রামবাসী, প্রতিবেশী, দরিদ্র, স্বজনেরা এসে বিনামূল্যে এই লিচু খেতে পারেন। এত বড়ো বাগানের লিচু কোনোদিনই বিক্রি করেননি মোস্তফা জামাল শামীম। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি যেন এই লিচু খেতে পারে এ জন্য বাগানটি করা হয়েছে উন্মুক্ত। নেই কোনো দেয়াল, সীমানাপ্রাচীর, কাটা তার বা নেটের বেড়া। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের একপাশে বয়ে গেছে ইছামতি নদী। নদীর পাড়ের বিপরীতের খোলা মাঠ। নানা ফসলের সমারোহের মাঝেই এই লিচুর বাগান। সারিবদ্ধ গাছগুলো ছেয়ে গেছে থোকায় থোকায় লিচুতে। নানা শ্রেণি পেশার নারী পুরুষ ও শিশুরা আসছেন বিনা পয়সার বাগানে লিচু খেতে। ইচ্ছেমতো লিচু খেয়ে পরিবারের জন্য নিয়েও যাচ্ছেন অনেকে। এ যেন এক চোখজুড়ানো দৃশ্য।

বাগান দেখতে আসা কলেজ শিক্ষক আরিফ আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, সম্প্রতি ফেসবুকে বিষয়টি দেখতে পাই। তারপরই ছুটে এসেছি স্বচক্ষে এমন উদ্যোগ দেখার জন্য। আমি সত্যিই মুগ্ধ। আসলে মানুষের জন্য কিছু করার সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। যার জ্বলন্ত উদাহরণ মোস্তফা জামাল শামীমের এই উদ্যোগ।

আরেক দর্শনার্থী পাভেল মৃধা বলেন, মানুষ ইচ্ছে করলেই এমন উদার ও জনবান্ধব হতে পারেন। বর্তমানে কেউ কাউকে এতটুকু ছাড় দেন না। সেখানে বাণিজ্যিক যুগে এসে নিজ খরচে ২০০ গাছের লিচু বিনা পয়সায় খাওয়ার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া বাগান মালিকের উন্নত মানসিকতার পরিচয়।

লিচু বাগানের মালিক, কিমিয়া সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা জামাল শামীম বলেন, রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না এই লিচু আবাদে। বাগানে দেওয়া হয় না কোনো নেট বা বন্ধনী। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখির জন্যও উন্মুক্ত করা হয়েছে এই লিচু বাগান। গ্রামের মানুষ এবং শিশুদের খুশি করতেই আমার এই উদ্যোগ। যেন বাচ্চারা আনন্দের সাথে নিজে হাতে লিচু পেড়ে খেতে পারে। আমি সবসময় বাগানে বা গ্রামে থাকি না। কিন্তু যখন শুনি বাগানে নানা শ্রেণির মানুষ দল বেধে এসে লিচু পেড়ে খাচ্ছেন, শুনে তৃপ্তি পাই, ভালো লাগে।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ির উপপরিচালক কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এমন উদ্যোগ সচরাচর দেখা যায় না। আমরা তার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। অনেক দরিদ্র মানুষ আছে, যাদের ইচ্ছে থাকলেও লিচু কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। তাদের জন্য এটা একটা বড় পাওয়া। সর্বোপরি সামর্থ্যবানরা যদি এমন উদারতা দেখান, তাহলে সমাজের দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবে।